মার্শাল জোসেফ টিটো-সোসালিস্ট ফেডারেল রিপাবলিক অফ যুগোস্লাভিয়ার জনক
যুগোস্লাভিয়ার ৫০০০ দিনার ব্যাংকনোটের সম্মুখে দেখা যায় মার্শাল জোসেফ টিটোর ছবি যাকে সোসালিস্ট ফেডারেল রিপাবলিক অফ যুগোস্লাভিয়ার জনক বলা হয় I তিনিই ছিলেন Non-Aligned Movement বা জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের স্তপতি I এই ৫০০০ ডিনার নোটের মাঝখানে SFR যুগোস্লাভিয়ার ৬ টি টর্চের প্রতীক আছে I এই ৬ টি টর্চ হচ্ছে সোসালিস্ট ফেডারেল রিপাবলিক অফ যুগোস্লাভিয়ার ৬ টি প্রজাতন্ত্রকে বোঝায়, তারা হলো সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া,মেসেডোনিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, মন্টিনেগ্রো I একদম উপরে সার্বিয়ান,ক্রোয়েশিয়ান, স্লোভেনিয়ান ও মেসেডোনিয়ান ভাষায় লেখা "ন্যাশনাল ব্যাংক অফ যুগোস্লাভিয়া I মার্শাল টিটো কে ছিলেন?
মার্শাল
টিটো (১৮৯২–১৯৮০)
– জোট-নিরপেক্ষ
আন্দোলনের অন্যতম
প্রবক্তা
একেবারেই
এক সাধারণ
ঘরে যাঁর
জন্ম পরবর্তীকালে
তিনিই হয়েছিলেন
যুগোস্লাভিয়ার লৌহমানব
বলে খ্যাত।
নাম তাঁর
মার্শাল ইওসিপ্
ব্রোজ টিটো
(Josif Broz Tito)। তিনি
ছিলেন দ্বিতীয়
মহাযুদ্ধের সময়
দেশটির অন্যতম
প্রধান সেনানায়ক।
পরে হয়েছিলেন
যুগোস্লাভিয়ার প্রথম
প্রেসিডেন্ট।সাবেক যুগোস্লাভিয়ার
রাজনৈতিক নেতা
জোসিপ ব্রজ
টিটো, যিনি
মার্শাল টিটো
নামেও পরিচিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
সময় অক্ষশক্তির
পক্ষে নাৎসিদের
বিপক্ষে ইউরোপে
সবচেয়ে কার্যকর
প্রতিরোধ ‘যুগোস্ল্যাভ
পার্টিজান’ এর
নেতৃত্ব দিয়েই
তিনি বিশ্বব্যাপী
পরিচিতি এবং
প্রশংসা পান।তার
ঘটনাবহুল জীবনের
আরেকটি আলোচিত
অধ্যায় হচ্ছে
জোট নিরপেক্ষ
আন্দোলনের নেতৃত্ব
দেয়া। ন্যামের
প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান
৫ নেতার
মধ্যে তিনি
ছিলেন অন্যতম।
যুদ্ধের
পর তিনিই
প্রথম যুগোস্লাভিয়াকে
সমাজতান্ত্রিক আদর্শে
গড়ে তুলেছিলেন।
লৌহকঠিন দৃঢ়তার
সঙ্গে দেশকে
ঢেলে সাজিয়েছিলেন
তিনি নতুন
করে তাই
তাঁকে অভিহিত
করা হয়
আধুনিক যুগোশ্লভিয়ার
জনক হিসেবে।
তিনি দেশ
ও তাঁর
নিজের ব্যক্তিত্বকে
এমন দৃঢ়তার
সঙ্গে দাঁড়
করিয়েছিলেন যে,
রাশিয়ার মতো
বৃহৎ শক্তির
প্রভাবকে পর্যন্ত
অস্বীকার করা
সম্ভব হয়েছিল।
এত বিরোধিতা
ও প্রভাবকে
অস্বীকার করেও
তিনি দাঁড়িয়েছিলেন
মাথা তুলে।
আর এমনি
করে তিনি
সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে
সৃষ্টি করেছিলেন
নিজস্ব মত
ও পথের।
লৌহমানব
ইওসিপ ব্রোজ
টিটোর জন্ম
১৮৯২ সালের
৭ মে
যুগোস্লাভিয়ার ক্রোয়েশিয়া
এবং স্লোভেনিয়া
প্রদেশের সীমান্তবর্তী
কুমরোভেক নামের
একটি শহরে।
পিতা
ছিলেন গাঁয়ের
এক গরিব
কৃষক। ঘরে
ছিল একপাল
সন্তানসন্ততি। টিটো
ছিলেন এমনই
নিঃস্ব পরিবারের
১৫টি ভাইবোনের
মধ্যে ৭ম
স্থানীয়। স্বাভাবিক
কারণেই বাল্যকালে
স্কুলে যাবার
সৌভাগ্য হয়নি
তাঁর। ফলে
১৩ বছর
বয়সেই বের
হতে হয়
উপার্জনের ধান্ধায়।
বাবা তাঁকে
পরিচয় করিয়ে
দেন পার্শ্ববর্তী
মফস্বল শহর
সিসাকের এক
তালাওয়ালার সঙ্গে।
সেখানে তিনি
তালা মেরামত
করতেন।
তারপর
সেখান থেকে
কয়েক বছর
পরে চলে
আসেন এয়েস্তে
শহরে। শিখতে
শুরু করলেন
কামারের কাজ।
লোহার কাজ
শেখার অবসরে
সময়ে তিনি
ঘুরতে লাগলেন
এ দেশ
থেকে সে
দেশে। এয়েস্তে
থেকে বোহেমিয়া
সেখান থেকে
জার্মানি।
কামারের
এই কাজ
নিয়ে দেশ-বিদেশে
ঘুরে বেড়াতে
বেড়াতেই তিনি
কর্মকার শ্রমিক
ইউনিয়নের সঙ্গে
মিশে যান।
অচিরেই সদস্য
হন ক্রোশিয়ার
সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক
পার্টির।
এর
পর-পরই
শুরু হয়ে
যায় প্রথম
বিশ্বযুদ্ধ। তিনি
কামারের কাজ
ছেড়ে দিয়ে
যোগদান করলেন
সেনাবাহিনীতে। নাম
লেখালেন যুগোস্লাভ
২৫তম রেজিমেন্টে।
তাঁদের বাহিনী
তখন যুদ্ধরত
ছিল সাইবেরিয়ায়।
সালটা ১৯১৪।
কিন্তু সেখানে
তিনি যুদ্ধ
বিরোধী প্রচারণা
চালানোর দায়ে
গ্রেফতার হন।
পরে
অবশ্য তিনি
এই অভিযোগ
থেকে মুক্তি
পান এবং
তাঁকে কারপাথিয়ান
ফ্রন্টে বদলি
করা হয়।
সেখানেই তিনি
যুদ্ধে অসীম
সাহসিকতা ও
বুদ্ধিমত্তার পরিচয়
দিলে কর্তৃপক্ষ
খুশি হয়ে
তাঁকে পদোন্নতি
দেন।
যুদ্ধের
পরে তাঁকে
বুকোভিন ফ্রন্টে
পাঠানো হয়।
সেখানেই তিনি
গুরুতরভাবে আহত
হয়ে রুশ
বাহিনীর হাতে
বন্দি হন।
রাশিয়ার বন্দিদশা
থেকে তিনি
ফিরে আসেন
১৯২০ সালে।
তবে ঘরে
ফেরার সময়
তিনি একটি
রাশিয়ান মেয়েকে
বিয়ে করে
নিয়ে আসেন।
এ বিয়ে
অবশ্য বেশিদিন
টেকেনি। ১৯৩৫
সালে টিটোর
এই বিয়ে
ভেঙে যায়।
যুদ্ধ
থেকে ফিরে
এসে তিনি
আবার যোগ
দেন তাঁর
পুরনো পেশায়—লোহালক্কড়ের
কাজে। বিজেলোভার
শহরে একটি
মিলে তিনি
চাকরি নেন
টেকনিশিয়ান হিসেবে।
এসময়ই তিনি
কমিউনিস্ট পার্টিতে
যোগদান করেন।
১৯২৩ সালে
বরণ করেন
তিনি গ্রেফতারি।
এই
সময় তাঁর
আর্থিক অবস্থা
ছিল খুবই
খারাপ। দারিদ্র্য
ছিল তাঁর
নিত্যসঙ্গী। তাঁর
আর্থিক অবস্থা
এমন ছিল
যে, তাঁর
দু-দুটো
সন্তান বিনা
চিকিৎসায় এবং
অনাহারে মারা
যায়। তিনি
অর্থের জন্য
নিজের সন্তানদের
বাঁচাতে পর্যন্ত
পারেননি।
১৯২৫
সালে ক্রাভিকা
শিপ ইয়ার্ডে
কাজ করার
সময়ও তিনি
একবার গ্রেফতার
হন এবং
তাঁর সাত
মাসের জেল
হয়। জেল
থেকে বের
হওয়ার পর
১৯২৭ সালে
জাগরেবের প্রাদেশিক
কমিউনিস্ট পার্টির
সদস্য নির্বাচিত
হন।
এরপর
১৯২৮ সালেই
যুগোস্লাভ কমিউনিস্ট
পার্টির কেন্দ্রীয়
কমিটির পুলিটব্যুরোর
ডেপুটি মনোনীত
হন এবং
আগস্ট মাসে
ক্রোয়েশিয়ান ও
স্লোভেনিয়ান কমিউনিস্ট
পার্টির সাধারণ
সম্পাদক নির্বাচিত
হন। সেই
বছরই তাঁর
পাঁচ বছর
জেল হয়।
জেল থেকে
মুক্তি পান
১৯৩৫ সালে।
এর পর
থেকেই পার্টিতে
তাঁর অবস্থানের
দ্রুত উন্নতি
হতে থাকে।
তিনি সেন্ট্রাল
কামিটির পুলিটব্যুরোর
সদস্য হন।
পার্টির সাংগঠনিক
কাজে ভ্রমণ
করেন মস্কো,
প্যারিস, প্রাগ,
ভিয়েনা প্রভৃতি
শহর।
এই
সময় আত্মগোপন
করার জন্য
তাঁকে নানারকম
ছদ্মবেশ নিতে
হতো—নিতে
হতো ছদ্মনামও।
এই ছদ্মানামগুলোর
মধ্যে একটি
ছিল টিটো।
নামটি তিনি
প্রায়ই ব্যবহার
করতেন। তখন
থেকেই টিটো
শব্দটি তাঁর
নামের অবিচ্ছেদ্য
অংশ হয়ে
দাঁড়ায়।
টিটো
১৯৩৫ সালে
মস্কোতে কমিউনিস্ট
পার্টির বলকান
সেকশনে কাজ
করেন এবং
১৯৩৭ সালে
কুয়োমিনতাং-এর
এক্সিকিউটিভ কমিটির
সেক্রেটারি জেনারেল
নির্বাচিত হন।
১৯৪০ সালে
যুগোস্লাভ কমিউনিস্ট
পার্টির যে
সম্মেলন হয়,
তাতে তিনি
সর্বসম্মতিক্রমে পার্টির
সেক্রেটারি জেনারেল
নির্বাচিত হন।
১৯৩৭
সালে টিটো
স্পেনের গৃহযুদ্ধ
দমনের জন্য
১৩০০ জন
স্বেচ্ছাসেবক প্রেরণ
করেন। এই
স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীই
পরে যুগোস্লাভিয়ার
জাতীয় মুক্তিবাহিনীতে
রূপান্তরিত হয়।
১৯৩৯
সালে শুরু
হয় দ্বিতীয়
মহাযুদ্ধ। ১৯৪১
সালের ৬
এপ্রিল জার্মানি
যুগোস্লাভিয়া আক্রমণ
করে। টিটো
দেশের এই
মহাদুর্যোগ মুহূর্তে
সকল দেশবাসীকে
ঐক্যবদ্ধ হওয়ার
আহ্বান জানান।
স্বাধীনতা রক্ষার
জন্য দেশের
যুবসমাজকে সংঘটিত
করে তিনি
প্রতিরোধ বাহিনী
গড়ে তোলেন
জার্মানির বিরুদ্ধে।
প্রথম
ধাক্কায় হিটলার
যুগোস্লাভিয়া দখল
করে নিলেও
টিটো তাঁর
মুক্তিবাহিনী নিয়ে
পরে দেশের
অধিকাংশ অঞ্চল
মুক্ত করেন
এবং পশ্চিম
সাইবেরিয়ার ইউজিস
নামক স্থানে
তাঁর হেড
কোয়ার্টার স্থাপন
করেন। এখান
থেকেই হিটলারের
দখলদার বাহিনীর
বিরুদ্ধে চলতে
থাকে সংগ্রাম।
১৯৪৩
সালের দিকে
টিটোর মুক্তিবাহিনীর
সদস্য সংখ্যা
বেড়ে গিয়ে
দাঁড়ায় আড়াই
লাখে। এই
সময়েই টিটোকে
মার্শাল উপাধি
দেওয়া হয়।
তখন থেকেই
তিনি পরিচিত
হন মার্শাল
টিটো নামে।
১৯৪৪
সালের ২৫
মে হিটলার
মার্শাল টিটোর
বসনিয়ায় অবস্থিত
হেড কোয়ার্টারে
ট্যাংক ও
বিমান নিয়ে
প্রচণ্ড আক্রমণ
চালান। টিটো
অল্পের জন্য
প্রাণে বেঁচে
যান। মে
মাসে হিটলারের
বিরুদ্ধে যৌথ
প্রতিরোধ গড়ে
তোলার জন্য
উইনস্টন তিনি
চার্চিল এবং
স্ট্যালিনের সঙ্গে
কয়েক দফা
বৈঠকে মিলিত
হন।
যুদ্ধে
অবশেষে মিত্রবাহিনীর
জয় হয়।
হিটলারের নাৎসি
বাহিনী পরাজিত
হয়। দীর্ঘ
কয়েক বছরের
সংগ্রামের পর
দখলদারের হাত
থেকে রক্ষা
পায় যুগোস্লাভিয়া।
কিন্তু দীর্ঘ
চার বছরের
একটানা যুদ্ধে
গোটা দেশই
বিধ্বস্ত। দেশের
প্রায় শতকরা
এগারো ভাগ
লোক নিহত
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে।
গোটা দেশ
তখন এক
ধ্বংসস্তূপ
এই
ধ্বংসস্তূপ থেকেই
তিনি আবার
শুরু করেন
সংগ্রাম- দেশকে
গড়ে তোলার
সংগ্রাম। ১৯৪৫
সালে তিনি
নির্বাচিত হন
দেশের প্রথম
প্রেসিডেন্ট।
কিন্তু
দেশগড়ার কাজেও
তাঁকে প্রতিমুহূর্তে
মোকাবেলা করতে
হয়েছে নানারকম
বাধাবিঘ্নের। দ্বিতীয়
মহাযুদ্ধের পর
বৃহৎ দেশ
রাশিয়া চাইত
তার পার্শ্ববর্তী
দেশ যুগোস্লাভিয়া
তার বশ্যতা
স্বীকার করুক,
রাশিয়ার প্রভুত্ব
মেনে চলুক।
কিন্তু
মার্শাল টিটো
ছিলেন স্বাধীনচেতা
ও দৃঢ়
মনের অধিকারী।
তিনি নিজের
দেশকে রাখতে
চাইলেন স্বাধীন
ও সার্বভৌম।
কিন্তু
স্ট্যালিন যখন
দেখলেন টিটো
সহজে তাঁর
কাছে মাথা
নত করছেন
না, তখন
আশ্রয় নিলেন
কূট কৌশলের।
ইচ্ছাকৃতভাবে যুগোস্লাভিয়ার
সীমান্তে গোলযোগ
সৃষ্টি এবং
দেশে অশান্তি
বাধানোর চেষ্টা
করতে লাগল
রাশিয়া। কিন্তু
হিতে বিপরীত
হলো। টিটো
রাশিয়ার এই
কূটকৌশলগত ব্যাপার-স্যাপার
তুলে ধরলেন
দেশবাসীর সামনে।
আহ্বান জানালেন
রাশিয়ার ষড়যন্ত্রের
বিরুদ্ধে রুখে
দাঁড়াবার। সারা
দেশে আবার
গড়ে উঠল
ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন।
দেশের সমগ্র
মানুষ ঐক্যবদ্ধ
হলো টিটোর
পেছনে। টিটো
তখন সারা
দেশের জনপ্রিয়
নেতা।বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী
সময়ে দুই
মেরুতে ভাগ
হওয়া বিশ্বে
প্রাথমিকভাবে সোভিয়েত
ব্লকের একজন
একনিষ্ঠ সমর্থক
হিসেবেই পরিচিত
ছিলেন টিটো,
যদিও স্টালিনের
সাথে তার
সম্পর্ক খুব
একটা উষ্ণ
ছিল না।
প্রথম থেকেই
টিটোর সরকারের
মাঝে গোঁড়া
মার্ক্সিস্ট বিশ্বাস
দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল
ছিল। এ
বিশ্বাসের বিরুদ্ধমতকে
একেবারে শুরু
থেকেই দমন
করতে শুরু
করেন টিটো।
তবে খুব
দ্রুতই তিনি
সোভিয়েত ব্লক
থেকে বেরিয়ে
গিয়ে স্বাধীনভাবে
যুগোস্লাভিয়া পরিচালনা
করার সিদ্ধান্ত
নেন। এতে
করে স্টালিনের
সাথে তার
সম্পর্কের অবসান
ঘটে, যা
বিশ্ব রাজনীতিতে
বেশ তাৎপর্যপূর্ণ
ঘটনা বলে
বিবেচিত হয়।
কমিউনিস্ট ব্লক
থেকে বেরিয়ে
গিয়েও সমাজতান্ত্রিক
কাঠামোতে রাষ্ট্র
পরিচালনা সম্ভব,
এ ধারণা
প্রতিষ্ঠিত করে
তার সিদ্ধান্ত।
আর সোভিয়েত
ব্লক থেকে
বেরিয়ে যাওয়ায়,
মার্কিন ব্লকের
দেশগুলোর সাথেও
অর্থনৈতিক সম্পর্ক
গড়ে তোলার
সুযোগ হয়
যুগোস্লাভিয়ার, যা
দেশটিকে অর্থনৈতিক
ও কূটনৈতিকভাবে
লাভবান করে।
টিটোর এই
সাহসী সিদ্ধান্তে
নিজ দেশে
তার জনপ্রিয়তা
আরো বৃদ্ধি
পায়, যদিও
একটি শ্রেণীর
নিকট তিনি
ছিলেন বর্বর
স্বৈরাচারী।১৯৫৩ ফলে
সালে স্ট্যালিনের
মৃত্যু হলো।
এরপর যাঁরা
রাশিয়ায় নেতৃত্বে
এলেন, তাঁদের
মনোভাব ততটা
কূট ষড়যন্ত্রী
ছিলেন না।
ফলে রাশিয়ার
সঙ্গে আবার
সম্পর্ক স্বাভাবিক
হয়ে এলো
যুগোস্লাভিয়ার। ১৯৫৩
সালের ৭
এপ্রিল যুগোস্লাভিয়াকে
সোশ্যালিস্ট ফেডারেল
রিপাবলিক ঘোষণা
এবং প্রণয়ন
করা হয়
নতুন সংবিধান।
স্নায়ুযুদ্ধ
ধীরে ধীরে
তীব্র রূপ
ধারণ করতে
থাকলে সদ্য
স্বাধীনতাপ্রাপ্ত ছোট
দেশগুলো নিজেদের
রাজনৈতিক অবস্থান
নিয়ে চিন্তিত
হয়ে পড়ে।
এ সময়
তারা সোভিয়েত
আর মার্কিন
ব্লকের বাইরে
নিজেদের মধ্যে
পৃথক জোট
নিরপেক্ষ পরিচয়
গড়ে তোলার
প্রয়োজনীয়তা অনুভব
করে। এই
চেষ্টা টিটো
সহ আরো
৪ জন্য
রাষ্ট্রনেতার অবদানে
সফলতার মুখ
দেখে, গড়ে
ওঠে ন্যাম।
১৯৬০-৮০’র
দশকের শেষদিক
পর্যন্তও ন্যামের
যথেষ্টই প্রভাব
ছিল। এই
আন্দোলনের প্রথম
সেক্রেটারি জেনারেল
হিসেবে নির্বাচিত
হয়েছিলেন টিটো।
ন্যামের কল্যাণে
বহির্বিশ্বে টিটোর
জনপ্রিয়তা আরো
বৃদ্ধি পায়,
বিভিন্ন দেশের
সাথে তিনি
যুগোস্লাভিয়ার অর্থনৈতিক
সম্পর্ক গড়ে
তুলতে সক্ষম
হন। নেহেরু,
ক্রুশ্চেভ, চার্চিল,
নাসের আর
কার্টারদের মতো
বিশ্বনেতাদের সাথে
শক্ত কূটনৈতিক
সম্পর্ক গড়ে
তোলেন তিনি।১৯৬৩
সালের ৭
এপ্রিল যুগোস্লাভিয়ার
সরকারি নাম
দেয়া হয়
‘সোশ্যালিস্ট ফেডারেল
রিপাবলিক অব
যুগোস্লাভিয়া’।
তখন থেকেই
বিভিন্ন বিষয়ে
সুর নরম
করতে থাকেন
টিটো। ধর্মীয়
ব্যাপারে সাধারণ
জনগণকে দেয়া
হয় স্বাধীনতা,
ব্যক্তিগত উদ্যোগকেও
স্বাগত জানানো
হয়। দু’বছরের
মাথায় তিনি
ক্যাথলিক চার্চের
সকল প্রকার
কার্যক্রম স্বতন্ত্রভাবে
পরিচালনার অনুমতি
দেন। ইতিহাসের
প্রথম দেশ
হিসেবে যুগোস্লাভিয়া
বিশ্বের যেকোনো
দেশের পর্যটকদের
জন্য ভিসামুক্ত
ঘোষণা করেন
টিটো। তার
একটি বড়
সাফল্য ছিল
দেশের প্রশাসনিক
এবং অর্থনৈতিক
কাঠামো বিকেন্দ্রীকরণ
করে পুরো
দেশে ছড়িয়ে
দেয়া, যেন
সর্বস্তরের মানুষ
তাতে যোগ
দিতে পারে।
শিক্ষা ও
স্বাস্থ্যখাতকে যতদূর
পারা যায়
সরকারিকরণ করে
দরিদ্রশ্রেণীর জন্য
বিনাখরচে পড়ালেখা
এবং চিকিৎসার
ব্যবস্থাও প্রশংসার
দাবিদার। তবে
বেসরকারি উদ্যোগের
অনুমতি দেয়ায়
মার্ক্সবাদীরা একপর্যায়ে
তার বিরুদ্ধে
মার্ক্সবাদ থেকে
সরে যাবার
অভিযোগ তোলে।
এর জবাবে
টিটো জানিয়ে
দেন, গোঁড়া
মার্ক্সবাদ নয়,
যুগোস্লাভিয়ার সাথে
মানানসই মার্ক্সবাদই
তিনি অনুসরণ
করবেন।১৯৭০ সালে
মর্শাল টিটো
দেশশাসনের জন্য
একটি নতুন
পদ্ধতির প্রবর্তন
করেন। দেশে
যৌথ প্রেসিডেন্সি
পদ্ধতি চালু
করা হয়।এই
পদ্ধতির আলোকেই
১৯৭৪ সালে
যুগোস্লাভিয়ার সংবিধান
পুনঃ প্রণয়ন
করা হয়
এবং এই
পদ্ধতি কার্যকর
করা হয়
মার্শাল টিটোর
মৃত্যুর পর।
জোসিপ
ব্রজ টিটোর
সাফল্য হিসাব
করতে গেলে
ক্যালকুলেটরের প্রয়োজন
হতে পারে।
কিন্তু তাতে
তার স্বৈরাচারী,
একনায়কীয় আর
বিরুদ্ধমতের প্রতি
প্রচণ্ড মাত্রায়
অত্যাচারী আচরণ
ঢেকে যায়
না। প্রশাসনিক
কাঠামোর কেন্দ্রে
নিজেকে এমনভাবে
প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন
তিনি যে
সর্বময় ক্ষমতা
তার কুক্ষিগত
হয়। ১৯৭৪
সালে তো
নতুন সংবিধান
প্রণয়ন করে
নিজেকে আজীবন
প্রেসিডেন্ট পদে
অধিষ্টিত করেন।
তার বিরুদ্ধে
যেকোনো ধরনের
সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহের
শামিল ধরা
হতো। মামলা,
জেল-জুলুম
থেকে রেহাই
পাননি দেশের
সেরা সেরা
লেখক, সাংবাদিক
আর বুদ্ধিজীবীরাও।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে
যখন থেকে
তার সরকার
কিছুটা উদার
নীতি অবলম্বন
করতে শুরু
করে, তখনও
বিরুদ্ধমতের প্রতি
অত্যাচার কমেনি
একটুও। আর
বিচার বহির্ভূত
হত্যাকাণ্ড তো
ছিল নিত্যকার
ঘটনা। টিটো
সবচেয়ে বেশি
যে বিষয়টি
উচ্চকণ্ঠে প্রচার
করতেন, তা
হলো যুগোস্লাভিয়ার
জিডিপি। তার
অপরিণামদর্শী অর্থনৈতিক
কাঠামোতে প্রচুর
পরিমাণে শিল্পায়নে
অর্থ আর
জমি বরাদ্দ
করা হয়,
কৃষিজমিতে গড়ে
তোলা হয়
বৈদেশিক সহায়তার
কলকারখানা। ফলে
তরতর করে
ফুলে-ফেঁপে
ওঠে জিডিপি।
কিন্তু তাতে
দেশের সুদূরপ্রাসী
ক্ষতি হয়।
আমৃত্যু
প্রেসিডেন্ট থাকার
সংবিধান পাস
করানোর পর
বেশি দিন
সে সুবিধা
ভোগ করতে
পারেননি টিটো।
সত্তরের দশকের
শেষ দিকে
তার স্বাস্থ্য
ক্রমাগত খারাপ
হতে থাকে।
রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম
থেকে তিনি
ধীরে ধীরে
নিজেকে গুটিয়ে
নিতে শুরু
করেন এবং
কেবল সর্বোচ্চ
পর্যায়ের সরকারি
কাজগুলোই করতেন।
১৯৮০ সালের
পয়লা জানুয়ারিতেই
হাসপাতালে ভর্তি
হন তিনি।
তার শরীরে
রক্ত সঞ্চালন
ঠিকমতো হচ্ছিল
না। ৩
দিন পর
হাসপাতাল থেকে
ছাড়া পেলেও
এক সপ্তাহের
মধ্যে আবার
হাসপাতালের বেডে
শুতে হয়
তাকে। এই
শয্যাই ছিল
তার মৃত্যুশয্যা।
১৯৮০
সালের মে
মাসের ৪
তারিখ শেষ
নিশ্বাস ত্যাগ
করেন জোসিপ
ব্রজ টিটো।
তার মৃত্যুতে
যুগোস্লাভিয়া সহ
পুরো বিশ্ব
রাজনীতিতেই নেমে
এসেছিল শোকের
ছায়া। ৪
জন রাজা,
৩১ জন
প্রেসিডেন্ট, ৬
জন প্রিন্স,
২২ জন
প্রধানমন্ত্রী সহ
মোট ১৫৮টি
দেশের প্রতিনিধির
উপস্থিতিতে তার
শেষকৃত্য সম্পন্ন
হয়, যা
ছিল তৎকালীন
সময়ের সর্ববৃহৎ
শেষকৃত্যানুষ্ঠান।
টিটোর
মৃত্যুর পর
যুগোস্লাভিয়ার অসংখ্য
স্থান আর
রাস্তার নামকরণ
করা হয়
তার নামে,
নির্মাণ করা
হয় তার
মূর্তি ও
স্মারক। কিন্তু
বর্তমানকালে সেগুলোর
অধিকাংশেরই নাম
পরিবর্তন করে
ফেলা হয়েছে,
ভেঙে ফেলা
হয়েছে তার
অনেক মূর্তি।
রাজনৈতিক জীবনে
কঠোর টিটো
ব্যক্তিগত জীবনে
ছিলেন ভীষণ
রকমের প্রেমিক
পুরুষ। একাধিক
নারীর সাথে
তার প্রণয়
সংঘটিত হয়
এবং তাদের
প্রায় সবাইকেই
তিনি বিয়ে
করেন।
তার
দুঃসাহসিক সামরিক
ক্যারিয়ার আর
দীর্ঘ ও
সফল রাজনৈতিক
ক্যারিয়ারে তিনি
নিজ দেশ
সহ ৬০টি
দেশ থেকে
সর্বমোট ১১৯টি
পদক ও
সম্মাননা লাভ
করেন। এর
মাঝে লিজিয়ন
অব অনার,
অর্ডার অব
বাথ, অর্ডার
অব মেরিট,
অর্ডার অব
লেনিন, ফেডার্যাল
ক্রস অব
মেরিট সহ
৯২টিই ছিল
আন্তর্জাতিক। এত
সমালোচনা থাকার
পরও এত
সম্মাননা প্রাপ্তিই
বলে দেয়
টিটোর প্রভাব
কতটা সুদূরপ্রসারী
ছিল। দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের পর
স্বাধীনতা পাওয়া
অধিকাংশ দেশই
কোনো না
কোনো একনায়ক
পেয়েছিল। তাদের
মাঝে টিটো
অবশ্যই অনন্য
ছিলেন, যিনি
সমাজতান্ত্রিক ধ্যান
ধারণায় দেশ
পরিচালনা করলেও
সোভিয়েত ব্লকের
রাজনৈতিক উপনিবেশ
থেকে দেশকে
বের করে
আনতে পেরেছিলেন।
তাই শত
সমালোচনা স্বত্বেও
ইতিহাসের পাতায়
অমর হয়েছেন
মার্শাল জোসিপ
ব্রজ টিটো।
মার্শাল
টিটো শুধু
যুগোস্লাভিয়ার নন,
আজও তিনি
গোটা ইউরোপের
সর্বশ্রেষ্ঠ সমরনায়ক
এবং সম্মানিত
ব্যক্তি হিসেবে
পরিগণিত।




No comments