মণিপুর ভ্রমণ ( প্রথম পর্ব )
ক্লাস নাইনে পড়ার সময় প্রায়ই একটি ম্যাপ পয়েন্টিং আসতো "ভারতের একটি সুপেয় জলের হ্রদ "I চোখ বুঝে ভারতবর্ষের উত্তর - পূর্ব দিকে শেষ রাজ্য মণিপুরের "লোকটাক হ্রদ " চিহ্নিত করতাম I কিং খান একটি মুভিতে বলেছেন "কেহতে হেই আগার কিসি চিজ কো দিল সে চাহোতো পুরি কাইনাত উসে তুমসে মিলানে কি কোশিস মে লাগ যাতি হেই " / It is saying that if you really desire something from the heart then the whole Universe will work towards getting that " অবশেষে লোকটাক লেক দেখার সুযোগ এসে গেলো I মণিপুর হচ্ছে উত্তর পূর্ব ভারতবর্ষের সাতবোনের ( আসাম, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মণিপুর ) মধ্যে একটি I মণিপুর কে "জুয়েল অফ দি ইস্ট "বলা হয়ে থাকে I সেভেন সিস্টারস স্টেটের অন্যতম এই রাজ্যে এক্স এক্স ক্রোমোজমের দাপট বেশি। সারা ভারত, মায় সারা পৃথিবী যখন পিতৃতান্ত্রিক আস্ফালনে দাসখত দিতে ব্যস্ত, তখন ভারতের এই রাজ্যটি সদর্পে ওড়ায় মাতৃতন্ত্রের নিশান। পৃথিবীর কাছেহয়ে ওঠে অনন্য উদাহরণ।

লোকটাক লেক মণিপুরের রাজধানী ইম্ফল থেকে ৩৯ কিমি দূরে বিষ্ণুপুর জেলার অন্তর্গত মৈরাং শহরে অবস্থিত I ১৯৪৪ সালের ১৪ এপ্রিল এই মৈরাং-এই আই এন এ পতাকা উত্তোলিত হয়। এখানে আই এন এ মিউজিয়ামও রয়েছে।হ্রদটি মণিপুরের লাইফলাইন। বিষ্ণপুরের এই হ্রদ ৪০ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় মিষ্টি জলের হ্রদ। ‘ফ্রেশ ওয়াটার লেক’ বলা হয়। নিকটবর্তী সেন্দ্রা হিল থেকে আরও মগ্ন হয়ে এই নিসর্গ সন্দর্শন করা যায়। কথায় বলে, প্রকৃতির নানা রূপ যা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, তার সব নিদর্শনই পাওয়া যায় ভারতে। কিন্ত, খুঁজলে এমন অনেক কিছুই পাওয়া যাবে, যা রয়েছে কেবল ভারতেই।
হ্রদ, তাও আবার ভাসমান! আশ্চর্য হওয়ার মতোই ব্যাপার! আসলে লোকটাক হ্রদটি একই জায়গায় থাকে, তাতে ভেসে বেড়ায় ‘ফামদি’, বা ভাসমান দ্বীপ। আর এই বিচিত্র ঘটনার জন্যই বিশ্বে খ্যাতি তার।
গাছগাছালি, জৈব পদার্থ ও মাটি মিশে তৈরি হয় এই ফামদি, যা স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ফামশং। লোকটাকের অনেকাংশেই ভেসে থাকতে দেখা যায় এমন ফামদি। ফামশাং দিয়েই তৈরি হয় ভাসমান দ্বীপ। যা অল্পবিস্তর নড়েচড়ে বেড়ায়। অর্থাৎ, যার স্থান পরিবর্তন হয়। এই ঘটনার জন্যই লোকটাক ‘ফ্লোটিং লেক’-এর শিরোপা পেয়েছে। তবে সব থেকে বড় আকারের দ্বীপটি রয়েছে হ্রদের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে। আকারে সেটি প্রায় ৪০ বর্গ কিলোমিটার। প্রসঙ্গত, বিশ্বের একমাত্র ‘ফ্লোটিং পার্ক’ রয়েছে এখানেই, নাম ‘কেইবুল লামজাও ন্যাশনাল পার্ক’।
মিষ্টি জল ও সবুজে ঢাকা বিস্তৃত এই অঞ্চলে স্বাভাবিকভাবেই পশুপাখির ভিড় রয়েছে। প্রায় ৭০ রকমের পাখি দেখা যায় লোকটাকের জলে। এবং হিমালয় পার করে, প্রায় ২৮ রকেমর পরিযায়ী পাখি আসে এই হ্রদে। হ্রদের জাতীয় উদ্যানে সম্বর, বার্কিং ডিয়ার ও ইন্ডিয়ান পাইথনের মতো বিরল প্রাণীও পাওয়া যায়।এই হ্রদকে কেন্দ্র করে এখানকার মানুষের জীবন গড়ে উঠেছে। বৈচিত্রপূর্ণ এই হ্রদে মৎস্যচাষ তো বটেই, বিভিন্ন ধরনের পাখির বাস এলাকার জীববৈচিত্র্যকে অনেকটা বাড়িয়ে তুলেছে। এছাড়া জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচের কাজ, পানীয় জল সরবরাহের কাজেও এই হ্রদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
পর্যটকরা গিয়ে শহরের নানা হোটেল বা রিসর্টে থাকতেই পারেন। কিন্তু, ভাসমান হ্রদে ভেসে বেড়াতেও নেহাত মন্দ লাগবে না। সেই ভাবনাই কাজে লাগিয়ে একটি বিশালাকার ফামদির উপরে তৈরি হয়েছে ট্যুরিস্ট হোম। আমরা বেছেছিলাম লোকটাক একোয়ামেরিন হোমস্টে I রাস্তায় যেখানে গাড়ী নামিয়ে দেবে, সেখান থেকে মিনিট দশেক নৌকায় করে পৌঁছতে হবে এই হোমস্টেতে I ডিনার, ব্রেকফাস্ট নিয়ে মাথা পিছু 1100 টাকা ভাড়া I তিনটি কটেজ বিশিষ্ট একটি ভাসমান ফামদির ওপরে গড়ে উঠেছে এই হোমস্টে টি I রাতের বেলায় পুরোটাই সোলার আলোয় আলোকিত থাকে I মৃদু ঠান্ডায়, চন্দ্রালোকিত আলোয় নির্জন পরিবেশে শহরের কলকোলাহল মুক্ত এইখানে একরাত কাটালে এক অনন্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়ে থাকা যাবেIআমরা যেহেতু 14 জনের দল গিয়েছিলাম, একটা হোমস্টে তে সবার রুম হয়নি I অর্ধেক গিয়েছিল লোকটাক একোয়া ইন I ওদের লোকেশন ভালো ছিল I attached বাথ ফেসিলিটি ছিল I লোকটাক একোয়ামেরিন মাথা পিছু 1100 টাকা ডিনার , ব্রেকফাস্ট, নৌকা দিয়ে (কমন বাথরুম ), লোকটাক একোয়া ইন 1500 টাকা ডিনার, ব্রেকফাস্ট, নৌকা দিয়ে I
কেইবুল লামজাও ন্যাশনাল পার্ক :
বিশ্বের একমাত্র ভাসমান জাতীয় উদ্যানে। লোকটাকের দক্ষিণ-পূর্বে কেইবুল লামজাও। ফামশাং দিয়ে তৈরি ছোটখাটো দ্বীপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়। ফামদি বা ফামশাং সমগ্র উদ্যানের চারভাগের তিনভাগ জুড়ে। ০.৮ মিটার থেকে দু’মিটার পর্যন্ত পুরু। ১৯৫৪ পর্যন্ত ৫২০০ মিটার জায়গাজুড়ে উদ্যানটি বিস্তৃত থাকলেও ১৯৭৭-এর ২৮ মার্চ ৪০০০ হেক্টরকে জাতীয় উদ্যানের স্বীকৃত দেওয়া হয়। এইসব ইতিহাস শোনাচ্ছেন নৌকার চালক। দু’পাশে ঘন গগনচুম্বী ফামশাংকে সাক্ষী করে এক ফালি জল দিয়ে বোট এগচ্ছে I সানগাই হরিণের এটাই শেষ প্রাকৃতিক বাসস্থান। এল্ডস ডিয়ার বা নাচুনি হরিণ।
এও মণিপুরের তথা ভারতের তথা বিশ্বের বিস্ময়। ভাসমান উদ্যানে পা ফেললেই উদ্যান নড়ে নড়ে ওঠে। তাই হরিণ বাবাজীবন আলতোআলতো পা ফেলে এদিক-সেদিক বাঁকেন। দেখে মনে হয় যেন নাচছেন! অধুনা বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের একটি। নৌকাচালক জানান, ভোর সাড়ে ছ’টা-সাতটা নাগাদ এলে কালেভদ্রে তেনাদের দেখা মেলে। ঘন ফামশাংয়ের ঝোপে নামলাম। লম্ফঝম্প করলাম। খানিক পরে আবার উঠেও গেলাম, পুরো বক্সিং রিংয়ের মতো! বা পাঞ্চিং ডলের পেটের মতো!
আই এন এ মিউজিয়াম :- মৈরাংয়ের গুরুত্ব ভারতীয় স্বাধীনতা ইতিহাসে সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে সবসময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৪ সালের ১৪ই এপ্রিল কর্নেল শওকত মালিক ভারতের মাটিতে এই মৈরাংয়ে প্রথমবার তিরঙ্গা উত্তোলন করেন। আজাদ হিন্দ বাহিনীর দফতর ছিল এখানে। শতাধিক বছরের সেই প্রাচীন বাড়ি আজও ইতিহাসের নানা সাক্ষ্য নীরবে বহন করে চলেছে। এই মৈরাংয়ে অবস্থিত আইএনএ মিউজিয়াম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বহু গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য, দলিল-দস্তাবেজ, অস্ত্রশস্ত্র, যুদ্ধে ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও অসংখ্য স্মারক চিত্র এই সংগ্রহালয়ে সযত্নে সংরক্ষিত আছে
No comments