গরমের ছুটি পড়লে পাহাড়ে যাওয়ার কথা প্রথম মনে পড়ে I কিন্তু সেবার মনে হলো একটু দূরে বাংলাদেশ ঘুরে আসার I প্রথম কারণ বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশ, দ্বিতীয় কারণ বহু প্রসিদ্ধ কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত দেখার প্রবল ইচ্ছে I ভিসা রেডি করা ছিল, মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহের কোনো একদিনে পেট্রাপোল -বেনাপোল সীমান্ত যা কিনা এশিয়ার বৃহত্তম স্থলবন্দর দিয়ে যশোর I যশোরে আমরা প্রথম রাত্রি কাটালাম I ভ্রমণের কথা মাথায় এলেই চোখে ভেসে উঠে ঝর্ণা, সাগর, পাহাড়, নদী কিংবা গহীন অরণ্যের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। এ চিত্তাকর্ষক দৃশ্যের সঙ্গে যদি যোগ হয় ঐতিহাসিক কোনো ব্যক্তির নাম, তার শৈশব কাটানো পথঘাট, বসতবাড়ি ও তার কর্ম জীবনের নিদর্শন, তবে তো কথাই নেই। ভ্রমনটা হয়ে উঠে আরও চিত্তাকর্ষক। যা মনকে করে প্রফুল্ল আর জ্ঞানের জগতকে করে প্রসারিত। মনের খোরাক আর জ্ঞানের পিপাসা মেটাতে তাই ভ্রমণটা তাই হতে পারে যশোরের কাছাকাছি কেশবপুরের সাগরদাঁড়ি গ্রাম। যে গ্রামের নাম লেখা হয়েছে বইয়ের পাতায়। যে স্থানে জন্মেছিলেন বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত।।

সকালবেলা বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সাগরদাঁড়ি মধূকবির বাড়ী দেখার উদ্দেশ্যে I যশোর থেকেসাতক্ষীরা যাওয়ার পথে পড়ে কেশবপুর I যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে ১৮২৪ সালের ২৫ শে জানুয়ারি জন্মেছিলেন কবি। তাঁর স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে সরকারী উদ্যোগে বাড়ি সংরক্ষণ করা হয়েছে, নাম দেয়া হয়েছে মধুপল্লী। যশোর শহর থেকে কবিবাড়ির দূরত্ব প্রায় ৪৫ কিলোমিটার।নানান প্রাচীন স্থাপনা আর কবির স্মৃতিতে সমৃদ্ধ মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি। কুটিরের আদলে তৈরি প্রধান ফটক পেরিয়ে প্রবেশ করতে হয় মধুপল্লীতে। সামনেই কবির আবক্ষ মূর্তি। ভেতরে কবির বসতবাড়ি এখন জাদুঘর।মধুসূদনের পরিবারের ব্যবহার্য কিছু আসবাবপত্র আর নানান স্মৃতিচিহৃ নিয়ে এ বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মধুসূদন জাদুঘর। চারপাশ প্রাচীরে ঘেরা, ভেতরে বাড়ির পশ্চিম পাশে আছে দিঘি। দিঘির ঘাটে কবি স্নান করতেন, যা সংরক্ষণ করা হয়েছে। " দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণাকাল! "
১৮৩০ সালে সাগরদাঁড়ি ছেড়ে কলকাতার খিদিরপুর চলে যান মধুসূদন। কলকাতায় থাকলেও কবির মন পড়ে থাকতো সাগড়দাঁড়িতে। মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে একবার কবি স্ত্রী-পুত্র কন্যাকে নিয়ে নদী পথে বজরায় করে বেড়াতে আসেন সাগরদাঁড়িতে। ১৮৬২ সালে কবি যখন সপরিবারে সাগরদাঁড়ীতে এসেছিলেন তখন ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে জ্ঞাতিরা তাঁকে বাড়িতে উঠতে দেয়নি। তিনি কপোতাক্ষ নদের তীরে একটি কাঠবাদাম গাছের তলায় তাঁবু খাটিয়ে ১৪ দিন অবস্থান করেন। বিফল মনে কপোতাক্ষের তীর ধরে হেঁটে বিদায়ঘাট হতে কলকাতার উদ্দেশে বজরায় উঠেছিলেন। তারপর থেকে এই বাড়ীতে তিনি কখনো পদার্পন করেন নি I কপোতাক্ষ নদে বেশী জল দেখতে পাই নি I হতে পারে সংস্কারের অভাব বা গ্রীষ্মকালের জন্য ! কবির স্মৃতিবিজড়িত এই কপোতাক্ষ নদ ( কপোত অর্থ পায়রা, অক্ষি অর্থ চোখ ) দেখলে মনে পড়বেই কবির বিখ্যাত সেই লাইনগুলি
" সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে |
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে ;
সতত ( যেমতি লোক নিশার স্বপনে
শোনে মায়া-যন্ত্রধ্বনি) তব কলকলে
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে!---
বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?"
সাগরদাঁড়ি স্মৃতিময়,কেবলই মাইকেলের স্মৃতি বিজড়িত বলে নয়,নয়নাভিরাম প্রাকৃৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে চাইলেও আসতে হবে সাগরদাঁড়ি।যেখানে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বড় হয়েছেন, লিখেছেন কবিতা,দেখেছেন স্বপ্ন,গেয়েছেন গান I সেইকারণে প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে এখনো অনুষ্ঠিত হয় সপ্তাহব্যাপি মধুমেলা যা দেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এসে থাকেন I
মহাকবি মধুসূদন দত্তের সাগরদাঁড়িতে যেভাবে যাবেন :
যশোর শহর থেকে প্রথমে আপনাকে যেতে হবে কেশবপুর উপজেলা সদরে। দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার। বাস টার্মিনাল থেকে বাসে করে যেতে পারবেন। কেশবপুর থেকে সাগরদাঁড়ি যাওয়ার জন্য আপনি ভাড়ায় মোটরসাইকেল পাবেন। এছাড়াও মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার নিয়েও ঘুরে আসতে পারেন।
মহাকবি মধুসূদন দত্তের সাগরদাঁড়ির রেস্টুরেন্ট ও আবাসিক ব্যবস্থা
যশোর শহরে অনেক আধুনিক রেস্টুরেন্ট বা আবাসিক হোটেল আছে। এছাড়া দত্তবাড়ির কাছেই আছে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের রেস্টহাউস। সেখানে থাকতে পারেন অথবা কেশবপুর উপজেলা ডাকবাংলোতেও থাকতে পারেন। তার জন্য আগে থেকেই যোগাযোগ করে রাখতে হবে। এছাড়া সাগরদাঁড়িতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের একটি মোটেল আছে।
মহাকবি মধুসূদন দত্তের সাগরদাঁড়ির প্রবেশমূল্য, খোলা ও বন্ধের সময়
মধুপল্লীতে প্রবেশমূল্য দেশি পর্যটক ১০ টাকা, বিদেশি পর্যটক ১০০ টাকা। পার্কিং মূল্য বাস ১০০ টাকা, মাইক্রোবাস, জীপ, গাড়ি ৫০ টাকা। মোটর সাইকেল ১০ টাকা।এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা এবং অক্টোবর থেকে মার্চ— প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে মধুপল্লী।শুক্রবার সাড়ে ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত বিরতি। মধুপল্লীর সাপ্তাহিক ছুটি রোববার। এছাড়া অন্যান্য সরকারী ছুটির দিনে বন্ধ থাকে।
No comments