পুন্যভূমি শান্তিপুর
কলকাতার কাছাকাছি মাত্র ৯৪ কিলোমিটার দূরে একদিন ঘুরে দেখা যেতেই পারে নদীয়া জেলার শতাব্দী প্রাচীন শান্তিপুর শহর I শিয়ালদাহ থেকে মাত্র আড়াই ঘন্টায় ট্রেনে শান্তিপুরে পৌঁছানো যায় I এসপ্লানেড থেকে বাসেও আসা যায় I শান্তিপুর কেন আসবেন?
১.শান্তিপুরী তাঁতের শাড়ি যা কিনা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর "শেষের কবিতা" উপন্যাসে উল্লেখ করেছেন, সেটি পরখ বা কেনার জন্য I
২.শান্তিপুরের ১৫০ বছরের পুরানো মিষ্টি নিখুঁতি টেস্ট করার জন্য I
৪. অসংখ্য বিগ্রহবাড়ী / ঐতিহাসিক জায়গা দর্শনের জন্য I
সন্ন্যাস গ্রহণের পরে গঙ্গা পেরিয়ে প্রথম শান্তিপুরেই এসেছিলেন চৈতন্য। শান্তিপুরের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র স্থাপত্য আর ইতিহাসের নানা উপকরণ। সেই তালিকায় যেমন রয়েছে মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের নামের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা তোপখানার মসজিদ, ইটের তৈরি আটচালার শ্যামচাঁদ মন্দির ( বাংলার সর্বোচ্চ আটচালা মন্দির ), ঔরঙ্গজেবের সেনাপ্রধান গাজী ইয়ার মহম্মদের তৈরি তোপখানা মসজিদ যা ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল , ১৭৯৬ সালে তৈরি দানবীর মরহুম শরিবত সাহেবের তৈরি সুদৃশ্য মসজিদ, ওস্তাগর পাড়ার মসজিদ-সহ প্রায় ২৬টি মসজিদ, সম্প্রীতির মেলবন্ধন শৈশব তলা, সৈয়দ সাহেবের মাজার, ব্রাহ্মসমাজের বাড়ি। এ ছাড়াও রয়েছে শান্তিপুরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বড় গোস্বামী বাড়ি-সহ ২৪টি বিগ্রহবাড়ি। তার মধ্যে ৯টি গোস্বামীবাড়ি বলেই পরিচিত। শান্তিপুর শহরের একেবারে লাগোয়া এলাকায় রয়েছে অদ্বৈতাচার্যের সাধনক্ষেত্র অদ্বৈতপীঠ। সেই সঙ্গে আছে একাধিক শিব ও কালী মন্দির। যেমন আগমেশ্বরী মন্দির, সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি, গোকুলচাঁদ মন্দির, বংশীধারী শিবমন্দির, সূত্রাগড়ে গণেশ মন্দির, জলেশ্বরের শিবমন্দির, শ্যামচাঁদ মন্দির। এই সব মন্দির ও বিগ্রহবাড়ির সঙ্গে শুধু যে ইতিহাস জড়িয়ে আছে তাই নয়, এই সব মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির কাজ বাংলার অন্যতম দর্শনীয় বিষয়। আবার কারও কারও দাবি, এই শহরে ছিল বৌদ্ধস্তূপও। কিন্তু কালের নিয়মে তাও নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। শান্তিপুর পৌরসভা ১৮৫৩ সালে স্থাপিত হয়েছিল যা কিনা অবিভক্ত বাংলার দ্বিতীয় প্রাচীন পৌরসভা I ভাষাবিদ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় শান্তিপুরী কথ্য বাংলাকে সবচেয়ে উত্তম /স্ট্যান্ডার্ড বলে অভিহিত করেছেন I
প্রাচীন কাল থেকে শান্তিপুর শহরে নানা সময়ে নানা ধর্মের মানুষ বসবাস করছেন। রেখে গিয়েছেন তাঁদের ধর্মচর্চার নিদর্শন। মন্দির, মসজিদ কিংবা ব্রাহ্মসমাজের এ ভাবে ‘গলা জড়াজড়ি’ করে থাকাটাকেই শান্তিপুর শহরকে অন্যদের তুলনায় আলাদা করেছে বলেই দাবি করেন শান্তিপুরের মানুষ। এই শহরের অন্যতম কৃতী সন্তান, সাহিত্যিক দামোদর মুখোপাধ্যায়, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আজিজুল হক, কবি করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, বীর আশানন্দ, নাট্যকার অহীন্দ্র চৌধুরী, যোগাচার্য শ্যামসুন্দর গোস্বামী আর কাছেই হরিপুরে যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের বাড়ি সংস্কারের অভাবে আজ জীর্ণ। শান্তিপুর শহরে ঢোকার আগে ফুলিয়ায় বাঙালির আর এক কৃতী সন্তান কৃত্তিবাসের জন্মভিটে। সবশেষে শান্তিপুরে চৌগাছাপাড়ায় ৫০ পয়সার ফুলুরি, ১ টাকার সিঙ্গারা খেতে ভুলবেন না I থাকার জন্য পৌরসভা পরিচালিত ৩ টা গেস্ট হাউস রয়েছে I সবশেষে বলি নৌকা ঠেলে দিয়ে "আজকে থেকে গেলে হতো না " এই "শান্তিপুরী ভদ্রতা " বাংলায় আর কোথাও পাবেন না 















No comments