মণিপুর ভ্রমণ ( তৃতীয় পর্ব / অন্তিম পর্ব )
মণিপুর ভ্রমণ ( তৃতীয় পর্ব / অন্তিম পর্ব )
দিনাঙ্ক ১১/১০/২০১৯ : প্রথমে যখন আমরা প্ল্যানিং করেছিলাম উখরুল শহর যেটা কিনা মণিপুরের একটি হিল স্টেশন (উখরুল মণিপুরের উচ্চতম জেলা ) সেটা সূচিতে ছিল না, পরবর্তীতে আমাদের সহযাত্রী প্রসেনজিৎদার (ইস্টবেঙ্গল প্রাণ)অনুপ্রেরণায় উখরুল অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, এবং উনি সেটাকে আরো একধাপ এগিয়ে ক্যাম্পিং করার কথা বলেছিলেন I ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সঙ্গে উখরুলের দূরসম্পর্ক রয়েছে I সেই গল্প বলছি পরে Iসেইমতো উখরুল শহর থেকে ২৩ কিমি ওপরে যেখানে শিরুই লিলি ফেস্টিভ্যাল হয় (শিরুই লিলি মণিপুরের জাতীয় ফুল, যা এপ্রিল -জুন মাসে শিরুই পাহাড়ের চূড়ায় হয় ) সেই ফাংরী -জোরচেং এলাকায় আমাদের জন্য ৭ টি তাঁবুর আয়োজন করেছিল সানগাই মুনলাইট ক্যাম্পিং নামে একটি সংস্থা I ক্যাম্পিংয়ে থাকা খাওয়া বন্দোবস্ত মাথাপিছু ১০০০ টাকা রেট হয় I উখরুলের কথা বলতে গেলে নয়ের দশকে ময়দান কাঁপানো সোমাতাই সাইজা সোসোর কথা বলতেই হবে I যাঁরা সেই সময় রেডিওতে ধারাভাষ্য শুনতেন "বল নিয়ে ছুটছেন সোসো " মনে থাকার কথা I এই সোসো উখরুলের ছেলে I এখন উখরুল F.C র প্রেসিডেন্ট, উখরুল কেন্দ্র থেকে বিজেপির হয়ে বিধানসভা ভোটে দাঁড়িয়ে মাত্র ২০০ ভোটে পরাজিত হয়েছেন I১৯৯৭সালে মোহনবাগান -ইস্টবেঙ্গল ডার্বি ম্যাচের আগে দুই কোচের বাদানুবাদে সারা ময়দান উত্তেজিত হয় Iশ্রদ্ধেয় প্রয়াত কোচ অমল দত্ত ম্যাচের আগে ( ডায়মন্ড সিস্টেম ) তাঁকে ব্যঙ্গ করে "শসা" বলেছিলেন Iফেডারেশন কাপ সেমিফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের জার্সিতে সেই ব্যঙ্গের জবাব দিয়েছিলেন সোসো৷ অমল দত্তের মোহনবাগানকে ৪-১ হারিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল৷ মিডফিল্ডার সোসোর দাপটেই সেই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিলেন ভাইচুং ভুটিয়া৷ সেই ম্যাচে লাল হলুদ জার্সিতে মাঠে নামার ছবি এখনও সোসোর ফেসবুকে৷মণিপুর চিত্রাঙ্গদা, ইরম শর্মিলা চানু, হেইস্নাম, মেরি কমের মতো সোসোর ও দেশ - আমাদের মতো ফুটবল ভক্তের কাছে ! মোরে থেকে বের হতে প্রায় দুপুর ১২ টা বেজে গেল, পাড়ি দিতে হবে ২০৭ কিমি পথ যার সিংহভাগ টাই পাহাড়ী রাস্তাI আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম খুব সকালে গাড়ী ছাড়বো, কিন্তু গতদিন বৃষ্টিতে পন্ড হওয়ায় আমরা প্রায় ৫ ঘন্টা লেটে রান করতে থাকলাম I মোরে থেকে ৩৮ কিমি ( দেড় ঘন্টা ) দূরে এক অপূর্ব হিল স্টেশন যার নাম টেংনৌপাল অবস্থিত Iইম্ফল থেকে মোরে বা মৈরাং থেকে মোরে যেদিক দিয়েই আসুন না কেন এই টেংনৌপালের ওপর দিয়েই আসতে হবে I মোরে শহরটি টেংনৌপাল জেলায় অবস্থিত I টেংনৌপালের উচ্চতা ৪৭৬০ ফুট যা কালিম্পঙের (৪১০০ ফুট) চেয়েও বেশী I এখানেই আছে গ্যাবি'স ক্যাফে I পাহাড়ের কোলে অনবদ্য ভিউ নিয়ে যার অবস্থান I
আমরা ভেবেছিলাম এখানে ব্রেকফাস্ট করবো, কিন্তু এখন সেটা লাঞ্চে পরিণত হয়েছে I যখন আমরা ঢুকলাম সাদা কুয়াশা ভিউ টাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো, লাঞ্চ খেতে খেতে আবহাওয়া ভালো হয়ে গেল I পিছনে সুউচ্চ পাহাড় সঙ্গে এক কাপ গরম কফি, তার মাঝে আপনি শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটালেও মনে হবে এই তো সবে এলাম ! গ্যাবি'স ক্যাফেতে থাকার জন্য দুটি কটেজ এবং তিনটি সাধারণ রুম আছে I কটেজগুলির ভাড়া ৩৫০০/- মতো I কটেজের ব্যালকনি তে বসে দূর পাহাড়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে প্রকৃতির সঙ্গে আত্মা মিলে যাবে তা ঠাওর করা মুশকিল I এখানে অত্যন্ত আধুনিক ওয়াশরুম রয়েছে, গ্যাবি'স ক্যাফে প্রাঙ্গনে বাচ্চাদের ঢেঁকি, দোলনা, স্লিপ ইত্যাদি রয়েছে যা বাচ্চাদের কে মাতিয়ে রাখবে, আর আছে নাম না জানা হরেক রকমের পাহাড়ী ফুল, জায়গার তুলনায় খাবারের দাম সেই তুলনায় সস্তা Iগ্যাবি'স ক্যাফেতে এক দম্পতি বিয়ে করার জন্য দলবল নিয়ে এসেছে I শুনলাম এইখানে অনেকেই বিয়ে করতে আসে এবং কটেজে রাত কাটায় Iগ্যাবি'স ক্যাফে তে খাবার অর্ডার করার পর প্রায় ১ ঘন্টা বাদে লাঞ্চ সার্ভ করলো , যদিও আমাদের কারো অসুবিধা হয় নি, সকলেই ছবি তুলতে ব্যস্ত ছিল I খুব জলদি থাকলে ফোনে অর্ডার করে দেবেন, তাহলে সময় নষ্ট হবে না I গ্যাবি'স ক্যাফে একটু লেট করে খাবার দিতে, এটা মাথায় রাখবেন I তবে লেট হলেও একটুও বোরিং ফীল করবেন না, এই বিষয়ে আমি নিশ্চিত I যায়হোক গ্যাবি'স ক্যাফে পর্ব শেষ করতে আমাদের ৩ টা বেজে গিয়েছিলো I উখরুল মণিপুরের রাজধানী ইম্ফল থেকে প্রায় ১০০ কিমি দূরে অবস্থিত I মণিপুর পাহাড়ী এলাকা হলেও ইম্ফল সমতলI ইম্ফল থেকে ১০ কিমি দূরে গেলেই পাহাড় চোখে পড়ে I বিঘার পর বিঘা সবুজ ধানের জমি, তার পেছনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়I আমি অনেক হিল স্টেশনে গেলেও এমন বৈপরীত্য ভূমিরূপ দেখিনি Iমণিপুর কল্পনায় আবৃত দেশ। কথিত আছে যে মণিপুর দেশটি আবিষ্কৃত হয় দেবতাদের নৃত্যের আনন্দের ফলে। এই ধারণাটি তার মনোহর লোক নৃত্যের মধ্যে জীবিত রয়েছে বলে মনে করা হয়।এই রাজ্য একটি অনুপম সৌন্দর্যের আশীর্বাদ প্রাপ্ত। ধোঁয়াশাচ্ছন্ন পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত ডিম্বাকৃতি আকারের উপত্যকা দেখে মনে হয় যেন ঈশ্বরের এক অনন্য শিল্পকর্ম। মণিপুর সৃষ্টি করতে প্রকৃতি তার সবচেয়ে পছন্দের উপহারগুলি ঢেলে দিয়েছেন। পাহাড় ও বনাঞ্চল একত্রিত হয়ে এটিকে একটি সরল শান্ত ত্ত মনোরম পশ্চাদপসরণ করে তুলেছে।এখানকার গ্রাম্য রাস্তা মণিপুরকে এক অসাধারণ সৌন্দর্য প্রদান করে। পর্যটন গন্তব্য হিসেবে মণিপুর এখনও প্রচারের ছটায় আসেনি। বিশ্বের মানুষ এখনও ঝাঁকে ঝাঁকে মণিপুর ভ্রমণ না করায় এই রাজ্য কলুষমুক্ত রয়েছে।ইম্ফলে এবং আরো একটি জায়গায়(চেকপোস্ট) “টি- ব্রেক” দেওয়ার পর আমরা যখন উখরুল জেলার জোরচেং (উচ্চতা ৭২০০ ফুট ) পৌছালাম ঘড়ির কাটা ১০ টা ছুঁই ছুঁই, এখানকার লোকেরা সন্ধ্যে সাতটার মধ্যে শুয়ে পরে, এতক্ষণ ধরে ওনাদের(ব্যবস্থাপকদের ) অপেক্ষা করতে হয়েছিল বলে মনক্ষুন্ন হয়েছিলেন I গ্রেসিয়াস ইন বলে একটা সরাইখানায় আমাদের ডিনার হলো যা কিনা আমাদের ক্যাম্পিং সাইট থেকে ১০০ মিটার দূরে অবস্থিত I সারাদিন জার্নির ধকল সহ্য করতে হয়েছিল বলে ত্রয়োদশীর চাঁদের বাহারে ক্যাম্পিং উপভোগ করার ইচ্ছে বা মন বা শক্তি কারোর ছিল না, যে যার টেন্টে ঢুকে গিয়ে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে নিজেকে চালান করে দিলো I আমার এটাই প্রথম ক্যাম্পিং, পাহাড়ের ওপর একটু সমতল জায়গায় আমাদের ৭ টা তাঁবু ছিল, আসে পাশে কোনো জনপদ নেই I সাক্ষী বলতে বেশ বড়ো একটা চাঁদ আর দূরে উখরুল শহরের জোনাকির মতো জ্বলতে থাকা আলো, রোমান্টিক পরিবেশ, কিন্তু সেটাকে বিদ্ধ করছে তীব্র ঠান্ডা, আমার বাইরে বসতে ইচ্ছা করলেও বাকিরা কেউ গরজ দেখালো না, অতঃপর ক্যাম্পে ঢুকে নাসিকা গর্জন I সাড়ে চারটের মধ্যে ভোরের আলো ফুটতে থাকলো I ধীরে ধীরে রক্তিম রশ্মিতে জোরচেং নিজেকে উন্মোচিত করতে থাকলো I সেই দৃশ্য অপূর্ব I ক্যাম্পিং ব্যাবস্থাপনায় কিছু ত্রুটি থাকলেও সকালের দৃশ্য এবং পরিবেশ সেটাকে ভুলিয়ে দিলো Iজোরচেং ক্যাম্পিং বাচ্চা, যুবক -যুবতী এবং মধ্য বয়সীদের ভালো লাগলেও, আমাদের টিমের বয়স্কদের কষ্ট হয়েছে I বয়স্ক লোক টিমে থাকলে উখরুলে রাত কাটানোটা বেস্ট হবে I কারণ ১০০ মিটার দূরে ল্যাট্রিন সকালবেলায় অনেকেই পছন্দ করবেন না, যদি না কারোর টেন্টের অনতিদূরে খোলা আকাশের নিচে ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগিয়ে পাহাড়ী গাছের আড়ালে স্বচ্ছ উখরুলকে অস্বচ্ছ করার অভিপ্রায় জন্মায় :)এবার নেমে আসার পালা I পরবর্তী এবং শেষ গন্তব্য / পর্ব ইম্ফল I

































No comments