"সুখের দেশ ভুটান" ‘থান্ডার ড্রাগন’এর দেশ ভুটান
ভারত-চিনের মাঝে হিমালয়ের কোলে ছোট্ট দেশ ভুটান। ছবির পোস্টকার্ডের মতো ছিমছাম এই দেশে যাওয়ার উদ্দেশ্য শুধু মাত্র তার নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করা নয়। শুনেছিলাম যে, জিএনপি-তে (গ্রস ন্যাশনাল প্রডাক্ট) নয়, ভুটান মনে প্রাণে বিশ্বাস করে জিএনএইচ-এ (গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস)। দেশের রাজা থেকে সাধারণ মানুষ, সকলের একটাই উদ্দেশ্য। তা হল আনন্দে থাকা, সুখে থাকা। সম্ভবত পৃথিবীর অন্যতম কার্বন ফ্রি দেশ I
কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে ড্রুক এয়ার এ যাত্রা শুরু করলাম I কোনো পারমিট করে যায় নি, কারণ পারো এয়ারপোর্টে সব ব্যবস্থা আছে I ইমিগ্রেশন এবং পারমিট, মুদ্রা বিনিময় এবং ভুটানি সিম সংগ্রহ করতে 30 মিনিট সময় লাগলো I ড্রাইভার সোনাম ওয়াংচুক এয়ারপোর্টে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলI যাত্রা শুরু হল পারো বিমানবন্দর থেকে। পারো থেকে গাড়ি নিয়ে সোজা ভুটানের রাজধানী থিম্পু। ঘন্টা দুয়েকের রাস্তা। যাত্রা শুরুর আগে গাড়ির চালক সোনম জানিয়ে দিলেন, জ়েব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পারাপার না করলে এবং যত্রতত্র ময়লা ফেললে জরিমানা দিতে হবে। থিম্পু পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেল। প্রথমেই চলে গেলাম থিম্ফু ইমিগ্রেশন অফিসে পরের দিন পুনাখা যাওয়ার পারমিশন নেওয়ার জন্য I থিম্ফু তে খামসুম ইন হোটেলে ছিলাম I সুন্দর হোটেল, ভুটানের মানুষ গুলি খুব সুন্দর I থিম্পু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সাজানো গোছানো শহর I কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল নেই I যত্র তত্র কেউ রাস্তা পার হয় না, জেব্রা ক্রসিং ধরে পার হয়, মানুষ পার হতে থাকলে, গাড়ী ক্রসিংয়ে থেমে যায় I বিকেলে গেলাম বুদ্ধ পয়েন্টে Iপাহাড়ের মাথায় পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বুদ্ধমূর্তি। ব্রোঞ্জের তৈরি, উচ্চতা ১৬৯ ফুট। এই স্থান থেকে পুরো থিম্ফু শহর টি কে বার্ডস eye ভিউ তে দেখা যায় I
দ্বিতীয় দিন ব্রেকফাস্ট করে পুনাখা ডে ট্রিপ করতে চললাম Iথিম্পু থেকে পুনাখা যেতে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা। যাওয়ার পথে দোচুলা পাস। এখানে থামতেই হল। আবহাওয়া ভালো থাকলে এখান থেকে দেখা যাবে তুষারাবৃত হিমালয়ের অংশ । এখানে আছে ১০৮টি চোর্তেন, একসঙ্গে যাদের বলে ড্রুক ওয়াংগিয়াল চোর্তেনস। আছে একটি বৌদ্ধমঠও। দোচুলার কাফেতে ধোঁয়া তোলা কফি এবং টাটকা কেক-প্যাটি খেয়ে আবার যাত্রা শুরু। পুনাখা ভুটানের শীতকালীন রাজধানী। পাহাড়ের মাঝে মাঝে সোনালি ধানখেত। নীচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে দু’টি নদী— পো চু এবং মো চু। এই দুই নদীর মাঝে পুনাখা জং (বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের গুম্ফা ও সরকারি দফতর)। টিকিট কেটে জংয়ের ভিতর ঘুরে দেখা যায়। বিকেলে ফিরে এলাম থিম্ফু তে I শপিং করার ইচ্ছে ছিল, দাম এক্সপেন্সিভ হওয়াতে খুব একটা বেশী করলাম না I
পরের দিন অর্থাৎ তৃতীয় দিনে গন্তব্য পারো। প্রথমেই আমার ড্রাইভার নিয়ে গেলো পারো এয়ারপোর্ট ভিউ পয়েন্টে Iপাহাড় ঘেরা পারোর বিমানবন্দর ভুটানের একমাত্র আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট— ‘দ্য মোস্ট ডিফিকাল্ট কমার্শিয়াল এয়ারপোর্ট অব দ্য ওয়র্ল্ড’। ছোট্ট রানওয়ে I পাহাড়ের মধ্যেদিয়ে বিভিন্ন টার্ন নিয়ে এই ছোটো রানওয়ে তে বিমান নামাতে হয় বলে এই তকমা পেয়েছে পারো ছু ( ছু মানে নদী ) তীরে এই বিমান বন্দরটি I সোনাম ট্রোফেল ইন হোটেলে চেক ইন করলাম I লাঞ্চ করে পারো থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার ফুট উপরে পাহাড়ের গায়ে তাকসাং বৌদ্ধমঠ দেখতে গেলাম । ১৬৯২ সালে তৈরি হয় এটি। লোককথা, বৌদ্ধগুরু পদ্মসম্ভব বাঘের পিঠে চড়ে তিব্বত থেকে সোজা উড়ে এসেছিলেন এখানে। যার জন্য এই মঠের আর এক নাম টাইগার মনেস্ট্রি। তিব্বতের মতো ভুটানের মানুষ তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের উপাসক। শুধু ধর্ম নয়, পোশাক, খাদ্য, সংস্কৃতি... ভুটানে তিব্বতের ছোঁয়া স্পষ্ট। বাড়ি থেকে পোস্ট অফিস, পেট্রল পাম্প থেকে সুলভ শৌচালয় সবেরই নকশা এক রকম! অধিকাংশ হোটেল, রেস্তরাঁ, দোকান মহিলাকর্মী দ্বারা পরিচালিত। ভুটানিরা সদাহাস্যময়, বড় আলাপি। এখানে মেয়েরা যেমন সুন্দরী, তেমনই স্বাধীনচেতা। ছোট থেকে বৃদ্ধ... সকলেই সব সময়ে পরেন জাতীয় পোশাক।ছেলেদের পোশাকের নাম "ঘো ", মেয়েদের "কীড়া " I টাইগার মনাস্ট্রি তে উঠতে গেলে 1 দিন সময় ওটার জন্য দিতে হবে.. আমার ফিটনেস নেই ক্লাইম্ব করার, কিছু স্যুভেনির কিনে চললাম Chele La পাসের উদ্দেশ্যে I
পারো থেকে চেলে লা (গিরিপথ) পাস প্রায় 30 কিমি I প্রায় ১৩ হাজার ফুট উপরে চেলে লা পাসে কনকনে ঠান্ডা বাতাসের জন্য এক মিনিটও দাঁড়ানো দায়। কিন্তু সাদা-নীল ধবধবে আকাশ, হাজার হাজার প্রেয়ার ফ্ল্যাগের মধ্য দিয়ে প্রকৃতিকে দেখার মজায় আলাদা । বেশী হাঁটা হাঁটি করলে breathing প্রবলেম হতে পারে I এখান থেকে অনেকে হা উপত্যকা যায় I ফিরে আসার সময় পারো ভিউ পয়েন্ট থেকে পারো শহরটিকে বার্ডস আই ভিউ তে দেখে নিলাম I
আজ, চতুর্থ দিন বাড়ী ফেরার পালা, সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেড়িয়ে পড়লাম শপিং করার জন্য I থিম্ফুর চেয়ে পারো শপিংর জন্য ভালো I রাস্তার দুই ধারে অসংখ্য দোকান যেগুলি চালাচ্ছে সদাহাস্যময় ভুটানী মেয়েরা I শপিং কমপ্লিট করে, দুপুর এ লাঞ্চ করলাম ভুটানী ডিশ "এমা দাশি " "থুকপা " সহযোগে I তারপর এয়ারপোর্টে চলে এলাম I
ভুটানের ভাষার নাম Dzonkha. বৌদ্ধ কান্ট্রি হওয়ায় সবরকম মাংস পাওয়া যায় I প্রকাশ্যে সিগারেট খাওয়া যায় না ! লুকিয়ে খেতে হয় I
বি:দ্রষ্টব্য: ফ্রেন্ডলি ট্যুরস এবং ট্রাভেলের মালিক রিনচেন এবং ড্রাইভার সোনামের জন্য আমাদের এই ভুটান সফরটি উপভোগ্য এবং স্মরণীয় হয়ে থাকবে
শেষে কিছু জরুরি তথ্য জানিয়ে রাখি –
১) ভুটানের প্রবেশপথ সড়কপথে পশ্চিমবঙ্গের জয়গাঁও বা জয়গাঁ দিয়ে, অথবা আকাশপথে পারো দিয়ে।
২) ভারতীয়দের ভুটান যেতে পাসপোর্ট লাগে না, তবে লাগে পারমিট বা অনুমতিপত্র। এই পারমিট পাওয়া যাবে ফুন্টশোলিং-এর ইমিগ্রেশন অফিস থেকে। পারমিটের জন্য জমা দিতে হবে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণস্বরূপ পাসপোর্ট/ভোটার আই ডি কার্ডের ফটোকপি ও দুটি সদ্যতোলা পাসপোর্ট সাইজ ছবি। সঙ্গে অবশ্যই রাখতে হবে অরিজিনাল পরিচয়পত্রটি। এই পারমিট পাওয়া যাবে কলকাতার ভুটান কন্স্যুলেট অফিস, টিভোলি কোর্ট, ১ এ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের অফিস থেকেও (এখন আর দেওয়া হয় না )। কিন্তু কলকাতার পারমিট থাক বা নাই থাক, ভুটানে পৌঁছে যাত্রীকে ইমিগ্রেশন অফিসে বায়োমেট্রিক টেস্টের জন্য যেতেই হবে। ফুন্টশোলিং-এ পারমিট দেওয়া হয় সোম থেকে শুক্র, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা ও দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা (ভুটান সময় - যা ভারতীয় সময় থেকে আধঘন্টা এগিয়ে)। পারমিট মুখ্যত থিম্পুর জন্য। থিম্পু ইমিগ্রেশন অফিসে সেটি দেখিয়ে, পুণাখা, হা, বুমথাং ইত্যাদি জায়গার জন্য পারমিট করাতে হবে, তবে, এর জন্য বেশি সময় লাগে না। ছবি ও পরিচয় পত্রের কয়েকটি বাড়তি কপি সঙ্গে রাখা ভাল।
৩) পারমিটের জন্য দরখাস্তে, ভুটানে কতদিন থাকতে চাই জানিয়ে যে তারিখ লিখতে হয়, তাতে ওখানে থাকার সময় ৫/৭ দিন বাড়িয়ে লেখা ভাল, কারণ উল্লিখিত তারিখ পেরিয়ে গেলে জেল বা বড় রকমের আর্থিক জরিমানা হতে পারে।
৪) ভারতীয় টাকা ও ভুটানি গুলত্রাম সমান। মুদ্রা বিনিময়ের দরকার নেই। সব জায়গায় ভারতীয় টাকা চলে।
৫) ভুটানে প্রায় সর্বত্র পলিথিন প্যাকেট ব্যবহার ও ধূমপান নিষিদ্ধ।
৬) ভুটানে ভারতীয় মোবাইল সিম কাজ করে না, প্রয়োজনে ভুটানি সিম কার্ডের জন্য গাইডের পরামর্শ নিন।
৭) কোথাও ফটো তোলা যাবে কি যাবেনা তার জন্যও গাইডের পরামর্শ নেওয়া ভালো।






























No comments