Header Ads

মিজোরাম ভ্রমণ (প্রথম পর্ব) A Trip to Mizoram (Part-I)



 মিজোরাম ভ্রমণ (প্রথম পর্ব)



ভ্রমণের জায়গা হিসেবে নর্থ ইস্ট ভারত বরাবরই উপেক্ষিত I কিন্তু উত্তর-পূর্ব জুড়ে ছড়িয়ে আছে অনেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য I এবারের গন্তব্য ছিল মিজোরাম যা কিনা লালডেঙ্গার দেশ, লুসাই পাহাড় অথবা ব্লু মাউন্টেনের দেশ I মিজোরাম অর্থ পাহাড়ী মানুষের রাজ্য। মি = মানুষ, জো = পাহাড়, রাম = রাজ্য।মিজোরাম অত্যন্ত শিক্ষিত রাজ্য, শিক্ষার হার প্রায় ৯১% যা কিনা সারা ভারতের মধ্যে তৃতীয়, শুধু কেরালা, লাক্ষাদ্বীপের পিছনে I
মিজোরাম নিয়ে বলতে গেলে মিজোরামের রাজধানী আইজল (Aizawl) নিয়ে আলাদা করে বলতেই হবে I রাজধানী আইজল ভারতের মধ্যে একটি অন্যতম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শৈলশহর I শহরটিকে প্রকৃতিদেবী নিজের হাতে যেন সাজিয়েছেন। শহরের আনাচে কানাচে রঙিন ফুলের সন্ধান মেলে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় চার হাজার ফিট উপরে অবস্থিত আইজল শহরের দক্ষিণ গা ঘেঁষে চলে গেছে কর্কটক্রান্তি রেখা। প্রায় সারা বছরই এখানে আবহাওয়া মনোরম থাকে। তাই যে কোনও সময়েই এখানে বেড়াতে যাওয়া যায়।রাতের আইজল আরো সুন্দরী I শহরের অধিকাংশ বাসিন্দার রয়েছে নিজস্ব গাড়ী । শহরবাসীর বেশভূষা ও চলনে বলনে পাশ্চাত্যের চাপ।আইজলের ছেলে মেয়েরা ভারতবর্ষের মধ্যে মনে হয় সবচেয়ে ফ্যাশনেবলI অধিকাংশ ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করেন নারীরা। নারীদের দাপট বেশী বলেই মনে হলোI মিজোরামে ক্রাইম রেট অত্যন্ত কম I পুরুষ কিংবা নারী উভয়ের ব্যবহার অমায়িক এবং অত্যন্ত মিশুক । আইজলে প্রচুর গাড়ী চলে, সেই কারণে জ্যামও হয় অত্যাধিক, কিন্তু ওরা সুশৃঙ্খল ভাবে লাইন দিয়ে গাড়ী চালায়, খুব প্রয়োজন না হলে হর্ন একদম বাজায় না বললেই চলে, কোনো পথচরী রাস্তা পার হতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ী থামিয়ে দেয়! রাজ্যের ৯০ শতাংশ লোকই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। সেই কারণে রবিবারে শুধু আইজল কেন, পুরো মিজোরাম বন্ধ হয়ে যায় I দোকান,রেস্টুরেন্ট, পার্ক, পর্যটন স্থল সব কিছুই বন্ধ, দল বেঁধে চার্চ এ গিয়ে প্রার্থনা করে I রাস্তা-ঘাটে ময়লা একদম ফেলে না, আইজলের প্রায় প্রতিটি রাস্তা সাফ সুতরো!
আইজলে আসতে গেলে নিকটতম রেল রোড আসামের শিলচর I শিলচর থেকে ১৭০ কিমি সড়ক পথে পাড়ি দিলে আইজল পৌঁছানো যায় I কলকাতা থেকে বিমানে মাত্র ১ ঘন্টায় আইজলে পৌঁছানো যায় I রিটার্ন ভাড়া মাথা পিছু ৬০০০-৬৫০০ টাকা I
আমরা কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে ৭ই অক্টোবর বেলা ১:০৫ র ফ্লাইটে রওনা দিলাম I সময়ের অনেক আগে এয়ার ইন্ডিয়া ঠিক ২:০৫ এ ল্যান্ড করলো ছবির মতো মিজোরামের একমাত্র এয়ারপোর্ট লেংপুই এয়ারপোর্টে I এয়ারপোর্ট রানওয়েতে ছবি তোলা নিষিদ্ধ হলেও,অনেকেই ছবি তুলছে বলে আমরাও ছবি তুললাম, CISF জওয়ানরাও মানা করছে না, তবে স্বীকার করতেই হবে ভারতবর্ষের মধ্যে এমন সিনিক রানওয়ে খুব কম আছে, অনেকটাই ভুটানের পারো এয়ারপোর্টের মতো I মিজোরামে প্রবেশ করতে গেলে মিজো ছাড়া আর সব ভারতীয়দের ILP( ইনার লাইন পারমিট ) প্রয়োজন I কলকাতা থেকেও ILP করা যায়, কিন্তু ফ্লাইটে এলে আগে থেকে ILP করার কোনো দরকার নেই, লেংপুই এয়ারপোর্টে ৭ দিনের জন্য টেম্পোরারি ILP নিতে মাত্র ১০ মিনিট সময় লাগে, ৩৫০ টাকা অ্যাডাল্টদের জন্য দিতে হবে, বাচ্চাদের লাগে না, দুটো সিম্পল ফর্ম দেয়, নাম, ঠিকানা, আধার নং, কোথায় থাকা হবে, কি উদ্দেশ্য আসা হচ্ছে –এই সব তথ্য উল্লেখ করতে হয়, কোনো ছবি লাগবে না I ILP প্রক্রিয়া শেষ করে এয়ারপোর্ট থেকে বের হলাম I হানিফ তালুকদার ( ড্রাইভার ) কে আগেই বলা ছিল, সে ডিজায়ার কার নিয়ে হাজির ছিল অনেক আগে থেকে, হানিফ ২০ বছর ধরে মিজোরামে গাড়ী চালালেও আদতে অসমের মানুষ I সে বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, অসমীয়া, মিজো পাঁচটি ভাষা বলতে পারে! লেংপুই এয়ারপোর্ট থেকে আইজলের দূরত্ব ৩৩ কিমি, প্রায় ১.৫ ঘন্টা পথ I আইজলের চালতল্যাং ট্যুরিস্ট লজ অনলাইনে আগে থেকে বুক করে রেখেছিলাম I মিজোরাম সরকার সরকারি টুরিস্ট লজ বুক করার জন্য একটি সুন্দর Mizoram Tourism বলে এপপ্স তৈরী করেছে I যেতে চাইলে আপনি এপপ্স অথবা মিজোরাম ট্যুরিজমের ওয়েবসাইট গিয়ে বুক করতে পারেন I সরকারি লজ গুলো বেশ সুন্দর, ঘর ভাড়া মাত্র ১০০০ টাকা, আমরা তিন রাত আইজলের চালতল্যাং ট্যুরিস্ট লজ এবং এক রাত থেনজলের থেনজল ট্যুরিস্ট লজ অনলাইনে বুক করেছিলাম I আইজলের ট্যুরিস্ট লজটি বেশ বড়ো, অনেক ঘর, উইথ ভিউ রুম রিকোয়েস্ট করাতে ওঁরা ১০৬ নং ঘরটি দিল I হিল স্টেশনে ১ হাজার টাকার পক্ষে বেশ বড়ো ঘর সরবরাহ করেছে I এখানে ডিনার অর্ডার করতে হয় সন্ধ্যা ৭ টার মধ্যে এবং ঘরে ডেলিভারি নিতে হবে রাত ৯ টার মধ্যে I আইজলে মার্কেট, দোকানপাট সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে বন্ধ হতে থাকে, তেমনি আবার সকাল ৭ টা থেকে সব খুলতে থাকে I মনোরম ঠান্ডা ছিল, ফ্যান চালিয়ে মোটা কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়লাম I
৮ ই অক্টোবর (শনিবার) আজ মিজোরাম ভ্রমণের প্রথম দিন I আজকে ঘুরবো রেইক (Reiek) এবং আইজল শহরের কিছু দর্শনীয় স্থান I আইজল থেকে ৩০ কিমি দূরত্বে মামিট জেলায় রেইক অবস্থিত I রেইকের উচ্চতা পাঁচ হাজার ফুটেরও বেশি। ঘন সবুজ বনাঞ্চলে ঘেরা পথ, মাঝে মাঝে ঝরনা – নীল আকাশ আর প্রান্তরের সবুজ মিশে তৈরি হয়েছে এক অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য। প্রথমে পথে পড়ল মিজোরামের প্রধান নদী টলং (Tlawng)। ব্রিজে নেমে দুই একটা ছবি তুলে উঠে পড়লাম গাড়িতে, এবার গিয়ে থামলো একটি ফলসের সামনে, নাম ভাইপুয়ানফো ফলস I রাস্তার ওপরেই এটা, দেখতে মন্দ নয়! প্রায় ২ ঘন্টা মতো সময় লাগলো রেইকে পৌঁছাতে, মাথা পিছু ৩০ টাকা এন্ট্রি ফি, গাড়ীর পার্কিং ২০ টাকা দিয়ে প্রথমে গেলাম রেইক টুরিস্ট রিসোর্ট I চা ছাড়া কিছুই পেলাম না, এখানে একটি টিপিকাল মিজো ভিলেজ আছে, সময় থাকলে দেখতে পারেন I রেইকের আসল আকর্ষণ হলো ২ কিমি মতো ট্রেক করে Reiek Tlang বা Reiek Peak এ ওঠা I যাঁরা এডভেঞ্চার ভালোবাসেন তাঁদের তো খুবই ভালো লাগবে I পারবো কি পারবো না ভেবে ভেবে, অবশেষে হানিফের আশ্বাসে সিদ্ধান্ত নিলাম রেইক টালাং যাবো I নর্মাল হাঁটলে ১ ঘন্টা উঠতে লাগে, নামতে লাগে ৪৫ মিনিট I পাহাড়ের রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে উঠতে লাগলাম, নাগাল্যান্ডের কয়েকজন স্কুল ছাত্রীও যোগ দিল, ওদের দেখে আরো মনোবল পেলাম I ওরা প্রচন্ড সাহসী পাহাড়ের একদম কিনারায় পা ঝুলিয়ে ছবি তুলছে, পায়ের তলায় ১০০০ ফুট গভীর খাদ! রেইক পিক ওঠার সময় যখন ২০ মিনিটের পথ বাকি থাকে তখন শর্টকাট রাস্তা ধরার জন্য ডান দিকের পাথরের সিঁড়ি ব্যবহার করেন I এই শর্টকাট সিঁড়ি দিয়ে উঠলে যেমন সুন্দর ভিউ পাবেন, তেমনি পাশেই গভীর খাদের দৃশ্য দেখে আঁতকে উঠবেন, এই সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আরো ভয় লাগবে , আমরা বাম দিকের রাস্তা ধরলাম, যাতে অতিরিক্ত ১০ মিনিট সময় বেশী লাগবে, বাম দিকের রাস্তায় কোনো সিঁড়ি নেই I অনেক স্টপেজ দিয়ে, ছবি তুলতে তুলতে যখন রেইক পিকে উঠলাম দেখলাম আমরা দেড় ঘন্টা সময় ব্যায় করেছি, হানিফের আরেকটা গুন হলো খুব সুন্দর ছবি তুলে দিতে পারে, সারা রাস্তা হানিফ সাহস জুগিয়ে গেল, সঙ্গে সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে দিলI সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫০০০ ফুট উঁচু রেইক পিকে উঠে দেখলাম, কুয়াশা ঢেকে দিয়েছে I আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে আইজল শহর দেখা যায় I মিজো ছেলে মেয়েরা খুব আনন্দ করছে ওখানে, কেউ নাচ করছে, কেউ গান গাইছে, কেউ বা পাহাড়ের ধারে পা ঝুলিয়ে ছবি তুলছে, এমন গভীর খাদ যে ৫ ফুট দূরে দাঁড়িয়েও ভয় লাগছে, ওরা কিনা সেখানে গিয়ে পা ঝুলিয়ে দিয়েছে I আবহাওয়া ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছিলো I জায়গাটির সৌন্দর্যও যেন ধীরে ধীরে বাড়ছিলো I অলরেডি ৩০ মিনিট কাটিয়ে ফেলেছি, আরো কিছু স্পট দেখার আছে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও নেমে আসতে হলো I আমরা খুব স্লো নেমেছিলাম , নামতেও ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট চলে গেল I রেইকে একটি ভিউপয়েন্ট রয়েছে, যাঁরা পাহাড়ে ট্রেক করবেন না, ২ কিমি দূরে রেলিং ঘেরা ভিউ পয়েন্ট থেকেও রেইক টলাং দর্শন করতে পারেন Iরেইকে লাঞ্চ করে আবার ঘন্টা দুয়েক পথ পাড়ি দিয়ে পৌছালাম সোলোমন টেম্পলে, যা আসলে কিনা বড়ো একটি চার্চ, তারপর গেলাম KV Paradise এ (লোকাল রা তাজ মহল বলে ) , যেতে যেতে ৬ টা বেজে গেছে, যথারীতি ভূতবাংলো হয়ে গেছে I আসলে রেইক পিকে উঠতে নামতে আমরা এত টাইম নিয়েছি যে অন্য স্পট গুলো দেখার সময় কমে গেছে, আইজলের দর্শনীয় স্থানগুলো সন্ধ্যা নামার আগেই বন্ধ হয়ে যায় I আইজল সিটি ভিউ দেখার আদর্শ জায়গা দুরটালাং ভিউ পয়েন্ট করোনার সময় থেকে এখনো অবধি বন্ধ আছে, সেই কারণে আইজল সিটি ভিউ দেখার দ্বিতীয় জনপ্রিয় জায়গা ফকল্যান্ড ভিউ পয়েন্টে গেলাম I দূর থেকে রাতের দার্জিলিং, গ্যাংটক, সিমলা দেখা আছে, কিন্তু ফকল্যান্ড ভিউপয়েন্ট থেকে আইজল সিটি ভিউ অত্যন্ত সুন্দর আকর্ষণীয় I দূর থেকে বাড়ী গুলো মুক্তমালা দিয়ে খচিত বলে মনে হচ্ছে, গরম কফি সহযোগে এত লম্বা আলোর মেখলা ১ ঘন্টা সময়ও কম পড়ে যাবে, হানিফ জানালো এখান থেকে ৮০% ভিউ আসছে, তাহলে দুরটালাং থেকে না জানি আরো কত সুন্দর লাগবে! এবার লজে ফেরার পালা, শনিবারের রাত, সকলে ঘরে ফিরছে, আইজলের বিশ্রী জ্যামে আটকে গেলাম I ৭ টার মধ্যে ডিনার অর্ডার করতে হবে, অগত্যা ফোন করে অর্ডার দিতে হলো I (দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্ত )

No comments

Powered by Blogger.