সোভিয়েত ইউনিয়ন : হারিয়ে যাওয়া এক দেশ!
সোভিয়েত ইউনিয়ন : হারিয়ে যাওয়া এক দেশ!
কয়েক দশক আগে রাশিয়াকে বলা হত সোভিয়েত রাশিয়া। পুরো নাম ছিল ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক। ছোট করে ইউএসএসআর। এ হেন রাশিয়ার পতন হল। সোভিয়েত, বানানভেদে সোভিয়েত ভেঙে খান খান। সমাজতন্ত্রের পতনে অনেকে উল্লসিত। কারও চোখে জল। ‘গ্লাসনস্ত’ ও ‘পেরেস্ত্রৈইকা’ বলে দুটো শব্দ এন্তার ঘুরপাক খেতে লাগল। রাশিয়ার পতনে বিশ্ব রাজনীতির কতটা কী ক্ষতি হয়েছে, তা এই লেখার আলোচ্য নয়। আলোচনার বিষয় হল, রাশিয়ার অসাধারণ সব বইয়ের কথা। ছোট ছেলেমেয়ে এবং বিশেষ করে বইপিপাসুদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গিয়েছে, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। রাশিয়া থেকে জাহাজবোঝাই হয়ে বই আসত। সেগুলো পাওয়া যেত একেবারে জলের দরে। ‘সস্তার তিন অবস্থা’ বলে যে কথাটা আছে, এই ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি অচল ছিল। বইগুলো যেমন ঝকঝকে ছাপা, বাঁধাই, দারুণ কাগজ, ছবি, তেমনি অনবদ্য সব বিষয়। বাংলায় যে রাশিয়ার বইয়ের চাহিদা বিপুল, তা বোঝা যেত প্রায় সব বইয়েরই বাংলা অনুবাদ থেকে। অনুবাদ করতেন ননী ভৌমিক, দ্বিজেন শর্মা, অরুণ সোম, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, কান্তি চট্টোপাধ্যায়, শুভময় ঘোষ প্রমুখ। এমনকি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সমর সেনও হাত লাগিয়েছিলেন অনুবাদ–কাজে। সে সব অনুবাদ হয়ে উঠেছিল মহার্ঘ। ছোটোবড়রা গোগ্রাসে পড়েছে সেই বই। তবে গল্প–উপন্যাস বাদ দিলে বাংলা অন্য অনুবাদগুলো যে সব সময় ভাল হত, তা নয়। অনেকে বলতেন, তুলনায় নাকি ইংরেজি অনুবাদ ছিল শ্রেয়। অবশ্যই এই বক্তব্য তর্ক সাপেক্ষ্য। রাশিয়ান বইয়ের প্রসঙ্গে এলে, প্রথমেই বলতে হয় ছোটদের বইয়ের কথা। রঙিন ছবি আঁকা কী সব বই! দাদুর দস্তানা, নীল দস্তানা, সিভকা–বুর্কা, নেকড়ে আর ছাগলছানা, হলদে–ঝুঁটি মোরগটি, শেয়ালের গল্প, শাদা কালো গা হাঁড়ি–চাঁ–চাঁ, মোরগ ও রঙেরা। যে দেখেছে, যে পড়েছে ভোলেনি কখনও। পাতলা বড় মাপের এই বইগুলো রঙিন ছবিতে ভরা, সঙ্গে একটু–আধটু গল্প। ছবি না গল্প কার আকর্ষণ বেশি বলা ছিল মুশকিল। বাঁধানো মোটা বইও ছিল— ‘রুশদেশের উপকথা’, ‘ইউক্রেনের উপকথা’, ‘উজবেকিস্তানের উপকথা’। রুশদেশের উপকথা এখনও পড়লে মন ভাল হয়ে যায়। লাল–কালো রঙের প্রচ্ছদে লাল আর সাদা তিন ঘোড়ার রথে সওয়ার ফুটফুটে বালক ও বালিকা। ইতিউতি ফুটে রয়েছে গোলাপ। গাড়ির সঙ্গে ছুটেছে ছোট্ট এক কুকুরছানা । সম্পাদনা ননী ভৌমিকের, অনুবাদক সুপ্রিয়া ঘোষ। প্রথমেই বিখ্যাত সেই ‘গোল রুটি’র গল্প। একেবারে আমাদের রূপকথার ঢঙেই শুরু হয়েছে— ‘এক ছিল বুড়ো আর এক বুড়ি। একদিন বুড়িকে বুড়ো ডেকে বলল: ‘ও বুড়ি একবার হাঁড়িটা চেঁছে, ময়দার টিন ঝেড়ে দেখ না, একটু ময়দা পাস কিনা। একটা গোল রুটি করে দিবি?’ বুড়ি তখনই একটা মোরগের পাখনা নিয়ে বসে গেল। হাঁড়ি চেঁছে, ময়দার টিন ঝেড়ে, কোনরকমে দু মুঠো ময়দা বের করল। ময়ান দিয়ে বুড়ি ময়দাটুকু ঠাসল। তারপর সুন্দর গোল একটা রুটি তৈরি করে, ঘিয়ে ভেজে, রেখে দিল জানলার ওপরে জুড়বার জন্যে।’ এখান থেকেই গল্পের শুরু। গোল রুটি গড়াতে গড়াতে বেরিয়ে পড়ে। পথে খরগোশ, নেকড়ে, ভালুক তাকে খেতে চায়। কিন্তু রুটি তাদের গান শুনিয়ে ফাঁকি দিয়ে পালায়। সেই গান কি আজও অনেকের মনে নেই? গানটা ছিল— ছোট্ট গোল রুটি, চলছি গুটিগুটি,.. এইভাবে সবাইকে ফাঁকি দিয়েও গোল রুটি শেষে শিয়ালের কাছে বুদ্ধির দৌড়ে হার মানে। কানে কম শুনি, এই অজুহাত দেখিয়ে শেয়াল রুটিকে জিভের ওপর উঠে এসে গান শোনাতে বলে। তারপর যা হওয়ার তাই। গোল রুটি যায় শেয়ালের পেটে। কেউ কেউ বলত, এসব বই নাকি আসলে ছিল কমিউনিস্টি প্রচার। যেমন এই গল্পে নাকি শেয়াল ‘বুর্জোয়া’ আর কারখানার মালিক ‘কর্পোরেট হাউস’–এর প্রতীক। এসব ছিল বড়দের ভাবনা। তর্ক। ছোটরা ওসব নিয়ে মাথা ঘামাত না। তারা মজত রূপকথার কল্পদৃৃশ্যে। এই রকম সীম বিচি, হলদে–ঝুঁটি মোরগটি, শেয়াল আর নেকড়ে, কেঠো পা ভালুক, বরফ–বুড়ো, ব্যাঙ রাজকুমারী ইত্যাদি ৩৩টি গল্প ছিল। প্রতিটি গল্পের সঙ্গেই মাভ্রিনা ও কুজনেৎসভের আঁকা ছবি অনবদ্য আবহ তৈরি করেছে। পাতলা পাতলা কার্টুন ছবির বইও আসত। যেমন অসাধারণ আঁকা, তেমনি বিষয়–বৈচিত্র্যেও অভিনব। ইয়েভগিন চারুশিনের লেখা এবং আঁকা একটা বইয়ের নাম ছিল ‘ছানাপোনা’। তাতে বনবেড়াল, নেকড়েছানা, হরিণছানা, ভালুকছানাদের কথা ছিল। ছানাগুলোর ছবি একেবারে পুতুপুতু, ভারি মিষ্টি। দেখলেই মনে হত আদর করি। জীবজন্তুদের ভালবাসার পাঠ শুরু হত ওই বই পড়েই। বইগুলো হাতে পড়লে এখন যারা বনবেড়াল, মেছোবেড়ালদেরও পিটিয়ে মারছে, থমকে যেত। অনুবাদ করেছিলেন ননী ভৌমিক। নিকলাই রাদ্লভের ‘ছবিতে ছবিতে গল্প’ অনবদ্য। যেমন ছবি, তেমন মজার বিষয়। একটা উদাহরণ দিই। গল্পটার নাম ‘সজারুর ভাঁড়ার’। একটা সজারু গাছের নিচে পড়ে থাকা অনেকগুলো আপেল কুড়োয়। কিন্তু নিয়ে যাবে কী করে? নিজেই পন্থা বার করে। আপেলগুলো গাছের নিচে এক জায়গায় রেখে সোজা ওপর উঠে যায়। তারপর পিঠটা নিজের দিকে করে পড়ে আপেলের ওপর। পিঠের কাঁটাগুলোয় বিঁধে যায় আপেল। সোজা হয়ে পিঠে বয়ে নিয়ে চলে যায় সব ফলগুলো। কিশোরদের জন্য ছিল আলেকজান্ডার বেলায়েভের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস ‘অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যান’। বাংলা অনুবাদ পাওয়া যেত ‘উভচর মানুষ’ নামে। অসাধারণ বই। তুমুল জনপ্রিয়। শেষে কাহিনীর নায়ক ইকথিয়ান্ডারের বাবার পুত্রহারানোর দুঃখ সত্ত্বেও এই বই না–পড়া এক বিরাট ক্ষতি। সোভিয়েত কল্পবিজ্ঞানের পথিকৃৎ বেলায়েভ। ওঁর এক আশ্চর্য সৃষ্টি তরুণ ইকথিয়ান্ডার বা মৎস্যকুমার। ‘উভচর মানুষ’ উপন্যাসে জলধিতলের এক আশ্চর্য জগৎকে জানা ও মানুষের বাসযোগ্য করার স্বপ্ন দেখেছেন লেখক। ননী ভৌমিক ঝরঝরে অনুবাদ করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে বেলায়েভের কথা একটু বলা উচিত। ছোটবেলা থেকেই ওঁর ঝোঁক স্বপ্ন দেখায়। ইচ্ছে ছিল মানুষ পাখির মতো উড়ুক। চেষ্টাও করেন। কিন্তু ছাদ থেকে পড়ে মেরুদণ্ড ভাঙে। মনে হয়েছিল, সেরে গিয়েছে। কিন্তু ৩২ বছর বয়সে দেখা দেয় হাড়ের ক্ষয়রোগ। জীবনভর এই কালব্যাধি তাঁকে ছাড়েনি। ৫৮ বছর বয়সে মারা যান। কিন্তু বছরের পর বছর শয্যাশায়ী থাকলেও অদম্য জীবনবাদী মানুষটির কল্পনা থেমে থাকেনি, থেমে থাকেনি কলমটিও। ওঁর প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পোপন্যাস ‘প্রফেসর ডোয়েলের মস্তক’। ১৯২৬ সালে বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে ওঁর নাম মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর একে একে উভচর মানুষ, জাহাজ ডুবির দ্বীপ, শূন্যে ঝাঁপ প্রভৃতি বই বিশ্ব সাহিত্যে স্থান করে নেয়। আনাতোলি আলেক্সিনের রোমাঞ্চ–উপন্যাস ‘ভয়ঙ্কর রোমহর্ষক ঘটনা’, ল্যুবোভ ভরোঙ্কভার দুটি বড় গল্প ‘যাদু তীর’ ও ‘শহরের মেয়ে’ কিশোর সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। সত্তর দশক বাংলায় ‘মুক্তির দশক’ হতে চেয়েছিল। সেই চাওয়ায় ছিল নানা ভুল। কিন্তু স্বপ্নটা ছিল খাঁটি। সেই সময় ৭০০ পাতার ঢাউস ‘বায়োগ্রাফি অফ কার্ল মার্কস’ বা ‘বায়োগ্রাফি অফ এঙ্গেলস’ পাওয়া যেত জলের দামে।
‘ডায়ালেকটিক্যাল মেটেরিয়ালিজম’ বা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ মার্কসবাদের বড় ভিত। তা নিয়ে পাওয়া যেত প্রচুর বই। মার্কস–এঙ্গেলসের সিলেকটেড ওয়ার্কসও পাওয়া যেত নামমাত্র দামে। ‘অ্যাবাউট লেনিন’ নামে একটি মোটা বাঁধানো বই এসেছিল মাত্র ৬০–৬৫ পয়সায়। এঙ্গেলসের ‘ডায়ালেকটিক্স অফ নেচার’ ছিল অবশ্যপাঠ্য। তখন বাঙালির বিদেশি সাহিত্যপাঠ বলতে ছিল মূলত ব্রিটিশ লেখক–লেখিকাদের গল্প–কবিতা, উপন্যাস। পরে যোগ হয় মার্কিনি সাহিত্য। সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসাবে কিছুটা ব্রাত্য রাখা হত রুশ সাহিত্যকে। তাই বলে ওরা যে কোনও অংশে কম যেত না, রুশ সাহিত্য হাতে এসে পড়ায় তা বাঙালি পাঠক টের পায়। রুশ সাহিত্যের সঙ্গে নিবিড় পরিচয় ঘটায় রাশিয়া থেকে প্রকাশিত বইগুলোই। লিও তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’, ‘অ্যানা ক্যারিনিনা’, ‘কসাক’, ‘ দ্য রেইডস’; ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মাদার’, ‘ফোমা গর্দেয়েভ’; আন্তন চেকভের ‘থ্রি সিস্টার্স’ ‘কাশ্তান্কা’; ফিওদর দস্তয়েভস্কির ‘ইডিয়ট’, ‘দ্য ব্রাদার্স কারামাজোভ’, ‘ডেমন্স’, ‘দ্য অ্যাডলেসেন্ট’, ‘অভাজন’; ইভান তুর্গেনেভের ‘ফাদার অ্যান্ড সন’; কবি–নাট্যকার আলেকজান্ডার পুশকিনের ‘দ্য ক্যাপ্টেনস ডটার’, ‘ইউজিন ওনেজিন’, ‘বরিস গোডুনোভ’; কবি ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির ‘আ ক্লাউন ইন ট্রাউজার, ‘ব্যাকবোন ফ্লুট’, ‘আ ফ্লাইং প্রোলেতারিয়ান’; নাট্যকার নিকোলাই গোগোলের ‘দ্য গভর্নমেন্ট ইসস্পেক্টর’, ‘ম্যারেজ’, ‘দ্য গ্যাম্বলার’, ‘ডায়ারি অভ আ ম্যাডম্যান’; বরিস পাস্তেরনাকের ‘ডাঃ জিভাগো’, ‘প্রোভেস্ট’ যা ইংরেজি অনুবাদে হয়েছিল ‘দ্য লাস্ট সামার’, লেটার্স ফ্রম টুলা’ ইত্যাদি বাঙালি গোগ্রাসে পড়েছে। এর অনেকগুলোই বিলিতি প্রকাশন থেকে পাওয়া যেত। কিন্তু সেগুলো গরিব বা মধ্যবিত্তের নাগালে ছিল না। তখন রুশ–মার্কিন ঠাণ্ডা যুদ্ধ চলছে। আলেকজান্ডার সলঝনিৎসনকে নিয়ে অনেক রাজনীতি হয়েছে। ওঁর ‘গুলাগ আর্চিপিলাগো’ বহু বিতর্কিত বই। তবে ওঁর ‘ফার্স্ট সার্কেল’ ছিল জনপ্রিয় বই। পাস্তেরনাককে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল ‘ডাঃ জিভাগো’র জন্য, উনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সত্তর দশকে মিখাইল সলোকভের ‘অ্যান্ড কোয়াইট ফ্লোজ দ্য ডন’–এর কথা উল্লেখ করতে হয়। যার বাংলা হয়েছিল ‘ধীরে বহো ডন’। আর ‘ভার্জিন সয়েল আপরুটেড’ বইটির ভারী সুন্দর বাংলা নাম ‘কুমারী মাটির ঘুম ভাঙল।’ আরও কত কত ছিল!
কল্পবিজ্ঞান, অ্যাডভেঞ্চার ও ফ্যানটাসির বইয়ের সম্ভারও ছিল দুর্দান্ত। যেগুলো গুণমানে আইজ্যাক অ্যাসিমভ বা আর্থার ক্লার্ককে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। রাদুগা প্রকাশন পেপারব্যাক এডিশনে প্রকাশ করেছিল ভ্যাসিলি আর্দামাত্স্কির ‘স্যাটার্ন ইজ অলমোস্ট ইনভিজিব্ল’। স্যাটার্ন আকাশের গ্রহ নয়, একটি ঘাঁটির নাম। সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা। বিষয়, ফ্যাসিস্টদের গুপ্তচর সংস্থার হানাদারি। কল্পবিজ্ঞান লেখক হিসাবে ভ্লাদিমির অব্রুশেভের নাম করতেই হবে। ওঁর ‘প্লুটোনিয়া’, ‘স্যানিকভ ল্যান্ড’ উল্লেখ্য। অব্রুশেভ নিজেই একজন অভিজ্ঞ এক্সপ্লোরার ছিলেন। এক প্রাগৈতিহাসিক স্থানে অভিযানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্লুটোনিয়ার কাহিনী। পাঠকদের ভূতত্ত্ব সম্বন্ধে আকৃষ্ট করবে এই উপন্যাস। এক দ্বীপের হারিয়ে যাওয়া নিয়ে লিখেছিলেন স্যানিকভ ল্যান্ড। কসমোলজি নিয়ে আলেকাজান্ডার কাজানস্তেভের ‘দ্য ডেসট্রাকশন অভ ফেনা’ পড়লে মুগ্ধ হতেই হবে। শুধু শিশুসাহিত্য বা সাহিত্য নয়, কত বিচিত্র বিষয় নিয়ে রাশিয়ান বই আসত তার ইয়ত্তা নেই। ধরা যাক অভিধানের কথাই। প্রচলিত বিষয়ের বাইরেও বিচিত্র সব বিষয়ের অভিধান আসত। বিজ্ঞানের প্রচলিত বিষয়ের অভিধান তো ছিলই, পাশাপাশি মিলত ‘কনসাইজ সাইকোলজিক্যাল ডিকশনারি’, ‘ডিকশনারি অভ পলিটিক্যাল ইকনমি’, ‘ডিকশনারি অভ ফিলসফি’ ইত্যাদিও। রাশিয়া নিরীশ্বরের দেশ। তাই ‘ডিকশনারি অভ বিলিভার্স অ্যান্ড ননবিলিভার্স’–এর মতো অভিধান হাতে পেয়েও অবাক হইনি। বিজ্ঞানকে যারা ভালবাসত, বিজ্ঞানের বইয়ের ওপর দুর্বলতা ছিল তাদের। অথচ বাংলা বইয়ের বাইরে ইংরেজিতে যে সব বই ছাপা হত, তা কেনার মতো রেস্ত পকেটে থাকত না। সেই অভাব পূরণ করে দিয়েছিল রাশিয়ান প্রকাশনা। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের টেক্সট বুক আসত। একেবারেই খটমট নয়, খুবই সহজবোধ্য ভাষায় লেখা। বিষয়গুলোকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই আলাদা। তাই দারুণ আকর্ষণীয়। আর দামে তো সস্তাই। তাকে আমি আরও সস্তা করে নিতাম। এক পরিচিতের বইয়ের দোকান ছিল। সেই দোকানের ছাপ মারা স্লিপ নিয়ে গেলে সাড়ে তেত্রিশ শতাংশ ছাড় মিলত। একেবারে সোনায় সোহাগা! একটা সিরিজ ছিল ‘সায়েন্স ফর এভরিওয়ান’। সেই সিরিজের কয়েকটা বইয়ের নাম উল্লেখ করলেই বিষয়–বৈচিত্র্য টের পাওয়া যাবে— ‘ফিজিক্স ইন ইয়োর কিচেন ল্যাব’, ‘হাউ উই সি হোয়াট উই সি’, ‘দিজ ফ্যাসিনেটিং অ্যাস্ট্রোনমি’, ইগর আকিমুশকিনের ‘ইথোলজি— হোয়াট অ্যানিম্যালস ডু অ্যান্ড হোয়াই’, ‘অ্যান এ টু জেড অভ কসমোনটিক্স’, ‘ম্যান অ্যান্ড অ্যানিম্যাল’, ‘ফান উইথ ম্যাথস অ্যান্ড ফিজিক্স’, ‘টেল্স অ্যাবাউট মেটালস’, ‘হোয়াই আই অ্যাম লাইক ড্যাড’, এন্টারনেইন ইলেকট্রনিক্স, ‘ইভলিউশন অভ বায়োস্ফিয়ার’, ‘কেমিক্যাল এলিমেন্ট’, ‘আ স্পেশশিপ ইন অরবিট (সায়েন্টিস্ট টু স্কুল চিলড্রেন)’, ইয়া পেরেলম্যানের দু খণ্ডের ‘ফিজিক্স ফর এন্টারটেইনমেন্ট’ তালিকা তৈরি করতে শুরু করলে শেষ করা যাবে না। পাঠক বইয়ের নামেই বুঝতে পারছেন বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কি আন্তরিক উদ্যোগ ছিল এই বইগুলো। আকর্ষণ বাড়াতে এবং সহজবোধ্য করতে পাতায় পাতায় থাকত রঙিন ছবি, ইলাসট্রেশন। ‘হোয়াই আই অ্যাম লাইক ড্যাড’–এর বাংলা অনুবাদ ‘কেন আমি বাবার মতো’। জেনেটিক্সের জটিল বিষয় এখানে হয়ে উঠেছে গল্প। বিবর্তন নিয়ে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় এই ধাঁচেই লিখেছিলেন ‘যে গল্পের শেষ নেই’। মানুষ তার বিজ্ঞান–প্রযুক্তি কীভাবে প্রাণীদের থেকে ধার করেছে তা নিয়েই লেখা ‘ম্যান অ্যান্ড অ্যানিম্যাল’। একটা গুবরে পোকা তার শরীরের চেয়ে বহুগুণ ভারী জিনিস ঠেলে নিয়ে যেতে পারে। তা দেখে কীভাবে মানুষ ক্রেনের নকশা তৈরি করেছে তার সচিত্র বিবরণ ছোটদের বিজ্ঞানশিক্ষায় প্রাণিত করার আদর্শ উদাহরণ। রিলেটিভিটি–র জটিল তত্ত্ব নিয়েও ছিল অসাধারণ সহজ বই। মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের দারুণ সব বই আসত। ছেলেমেয়ে কীভাবে মানুষ করতে হবে থেকে মনোবিজ্ঞান, মনোরোগ— সব বিষয়ের বই–ই মিলত। যেমন, ‘আ বুক অ্যাবাউট ব্রিংগিং আপ চিলড্রেন,’, ‘দ্য সাইকোলজি অভ ফ্যানটাসি’, ‘চাইল্ড সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড ইউ’, ‘ম্যান সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিজম, ‘দ্য রিড্ল অভ সেল্ফ’। প্রোগ্রেস পাবলিশার্স থেকে পেপারব্যাক এডিশনে আসত ‘এবিসি অভ সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিক্যাল নলেজ’ সিরিজের বই। তাতে থাকত ‘হোয়াট ইজ হিস্টোরিক্যাল মেটেরিয়ালিজ্ম, হোয়াট ইজ ডায়ালেকটিক্যাল মেটেরিয়ালিজ্ম, হোয়াট ইজ ফিলসফি, হোয়াট ইজ সায়েন্টিফিক কমিউনিজম ইত্যাদি। চীনের সঙ্গে তখন রাশিয়ার সুসম্পর্ক ছিল না। তাই ‘মাওইজ্ম অ্যান্ড মাও’স এয়ার্স’–এর মতন বইও আসত। তাতে মাওবাদকে ‘এ ভ্যারাইটি অভ অ্যান্টি–কমিউনিজ্ম’ বলেও অধ্যায় থাকত। এই ফঁাকে একটা কথা না বললে ফঁাক থাকবে। সেই রাশিয়া থেকে কমিউনিজম্ বিদায় নিল, কিন্তু আজও চীন কমিনিস্ট। বোঝা নিশ্চয় ভুল হয়েছিল। আসা যাক ইতিহাসে। ভারতীয় ইতিহাসের খুঁটিনাটি মার্কসের নজর এড়িয়ে যায়নি। তাঁর লেখা ‘নোটস অন ইন্ডিয়ান হিস্টরি’ ইতিহাসের ছাত্রদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়াও জি বনগার্ড–লেভিন ও এ ভিগাসিনের লেখা ‘দ্য ইমেজ অভ ইন্ডিয়া— দ্য স্টাডি অভ অ্যানসিয়েন্ট ইন্ডিয়ান সিভিলাইজেশন ইন দ্য ইউএসএসআর’, ফিওদর করোভকিনের লেখা ‘পৃথিবীর ইতিহাস: প্রাচীন যুগ’ উল্লেখ্য। প্রগতি প্রকাশন প্রকাশিত বইটি অনুবাদ করেছিলেন হায়াৎ মামুদ। বইটির সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল রঙিন মানচিত্র, অসংখ্য ছবি। ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ লিখেছিলেন কো. আন্তোনভা, গ্রি. বোন্গার্দ–লেভিন, গ্রি. কতোভ্স্কি। অনুবাদ করেছিলেন মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় ও দ্বিজেন শর্মা। এক অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভারতের ইতিহাসের বিশ্লেষণ। শুধু সাহিত্য, বিজ্ঞান ও বিপ্লব নিয়েই বই আসত এমন নয়, শিল্প সম্বন্ধীয় বইও আসত প্রচুর। আসত বিখ্যাত বিখ্যাত শিল্পীর আঁকা ছবির অসাধারণ সব ক্যাটালগ। সবই রঙিন, আর্ট প্লেটে ছাপা। এ তো গেল বইয়ের যৎসামান্য নমুনা। ও দেশ থেকে প্রচুর মাসিক পত্রপত্রিকা আসত। ইংরেজিতে ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’, বাংলায় ‘সোভিয়েত দেশ’। মেয়েদের জন্য ছিল ‘সোভিয়েত নারী’। তাতে উলবোনার নকশা থেকে রান্না, নানান তথ্য থাকত। আসত স্পোর্টস ম্যাগাজিনও। সম্ভবত সত্তরের শেষের দিকে বেরোতে শুরু করে ছোটদের পত্রিকা ‘মিসা’। ভাল মেকানিক্যাল নিউজপ্রিন্টে ছাপা। ঝকঝকে। আমরা বলতাম অয়েলি পেপার। বেশ বড় সাইজ। তাই পড়া হয়ে গেলে সেগুলো দিয়ে বইয়ের উত্তম মলাট হত। তবে ডাকঘর থেকে মারও যেত প্রচুর। বইমেলায় পত্রিকার গ্রাহক হলে বিস্তর উপহার মিলত। একবার উজবেকিস্তানের ফোক সংঙের একটা রেকর্ড পেয়েছিলাম। একেবারে পাতলা কাগজের মতো, হালকা নীল, স্বচ্ছ। এখনও যত্নে রাখা আছে। ভাল ভাল ক্যালেন্ডার, ডাকটিকিটও পাওয়া যেত। আসত বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা ‘সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’। ইংরেজি ‘রিডার্স ডাইজেস্ট’–এর মতো ছিল ‘স্পুটনিক’। বেশ কয়েকটা দোকান ছিল, যারা শুধু রাশিয়ার বই–ই বিক্রি করত। তার মধ্যে কলেজ স্ট্রিটে ছিল ভোস্তক, মণীশা। বিংশ শতাব্দী ও ন্যাশনাল বুক এজেন্সিতেও পাওয়া যেত। বইমেলাতে বিশাল স্টল হত রাশিয়ান বইয়ের। রাশিয়ার পাশাপাশি চীন থেকেও আসত সস্তার বই, পত্রিকা। তবে সেগুলোর গুণমান রাশিয়ান বইয়ের ধারেকাছে আসত না। অনেকে নাক সিঁটকে বলতেন, রাশিয়া বই পাঠাত নাকি প্রচারের জন্য। হতে পারে। ক্ষতি কী? শিশুসাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞানের বই ছাপিয়ে বিলি করার মতো প্রচার খারাপ তো নয়। রাশিয়ার পতনের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ থিতিয়ে পড়ল রাশিয়ান বইয়ের বাজার। ওখান থেকে বই আসা বন্ধ হয়ে গেল। এখানকার দোকানগুলোয় যে বইগুলো ছিল সেগুলো কিছু দাম বাড়িয়ে বিক্রি হতে লাগল। তারপর একদিন ইতি। হারিয়ে গেল ফরেন ল্যাঙ্গোয়েজেস পাবলিশিং হাউস বা বিদেশী ভাষায় সাহিত্য প্রকাশালয়, প্রগতি প্রকাশন বা প্রোগ্রেস পাবলিশার্স, মির, রাদুগার মতো প্রকাশন সংস্থা। বইপড়ুয়াদের জন্য তৈরি হল শূন্যতা। ছোটদের জন্য রাশিয়ার সেই সব অনবদ্য বইগুলো এলে এখনকার ছোটরাও নিশ্চয় পড়ত। দাদুর দস্তানা, গোলরুটির গল্প তাদের সেল্ফি এবং ফেসবুকের আত্মপ্রচার থেকে সরিয়ে নিয়ে যেত কল্পনার অন্য রাজ্যে।চুক আর গেক-কে মনে পড়ে? মনে আছে আলিওনুস্কার কথা? ধলা কুকুর শামলা কান, মিশকা ভালুক আর আনাড়ির মজাদার কাণ্ডকারখানা? আজ থেকে তিরিশ-চল্লিশ বছর আগেও বাঙালির ছোটবেলার সঙ্গী ছিল এই বইগুলো— বাংলা অনুবাদে সোভিয়েত শিশু-কিশোর সাহিত্যের সম্ভার। এখন যারা চল্লিশ বা পঞ্চাশের কোঠায়, তাঁদের অনেকেই মনে করতে পারবেন ছোট্ট চড়ুইপাখি পুদিকসোনার গল্প, সিভকা-বুরকার জাদু ঘোড়া, নীলচে ফড়িং, বাবায়াগার অদ্ভুতুড়ে কালাজাদুর মন্তর।একটু বড় হতে জন্মদিনে হাতে আসত ‘ভাল মানুষ হওয়া’র শুভেচ্ছা মাখা রঙিন বইগুলো— টলস্টয়, পুশকিন, গোর্কি, চেখভ, দস্তয়েভস্কি, গোগোল, তুর্গেনেভ-এর মতো লেখকদের ধ্রুপদি রচনা। ছিল মনীষীদের জীবনকথা, বিজ্ঞানের বিচিত্র খবরে বিশ্বপরিচয়ের হাতছানি। রুশ সাহিত্যের এই সব অমূল্য সম্পদ অল্প দামে বাঙালি পাঠকের হাতে পৌঁছে যেত ‘প্রগতি’ বা ‘রাদুগা’র মতো প্রকাশনার হাত ধরে।১৯৩১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় প্রকাশন সমিতি পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় রাশিয়ার সমাজতন্ত্রী মতবাদের পাশাপাশি সোভিয়েত সাহিত্য অনুবাদ ও প্রচারের জন্য একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে, যার নাম ‘বিদেশি শ্রমজীবীদের প্রকাশন সমিতি’। ১৯৩৯ সালে সংস্থার নতুন নাম হয় ‘বিদেশি ভাষায় সাহিত্য’ প্রকাশনালয়, পঞ্চাশের দশকে সেখানে গড়ে ওঠে স্থায়ী বাংলা বিভাগ। ১৯৬৩ থেকে ‘প্রগতি’ নামেই বাড়তে থাকে এর জনপ্রিয়তা। এর বাংলা বিভাগে সে সময় অনুবাদক হিসেবে ছিলেন ননী ভৌমিক, নীরেন্দ্রনাথ রায়, শুভময় ঘোষ, সমর সেন, বিষ্ণু মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। ননী ভৌমিকের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’, ‘চলো সোভিয়েত দেশ বেড়িয়ে আসি’র মতো লেখার পাশাপাশি শিশুকিশোর সাহিত্যের অনুবাদ বিখ্যাত হয়েছিল। আর বিষ্ণু মুখোপাধ্যায় করতেন সামাজিক বা রাজনৈতিক মতাদর্শমূলক সাহিত্যের অনুবাদ। আলেক্সেই টলস্টয়ের ‘দ্য লেম প্রিন্স’-এর অনুবাদ ‘খোঁড়া রাজকুমার’ খুব জনপ্রিয় হয়। অনুবাদকের নাম রাধামোহন ভট্টাচার্য— ‘উদয়ের পথে’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ এর মতো ছবির অভিনেতা।সত্তরের দশকে এই বিভাগ সমৃদ্ধতর হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা পেলে সোভিয়েত সাহিত্যের বাংলা অনুবাদের বাজার আরও বিস্তৃত হয়। এই পর্বে প্রগতি প্রকাশনের বাংলা বিভাগে অনুবাদকের কাজ নিয়ে যান কলকাতা থেকে অরুণ সোম, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়; বাংলাদেশ থেকে হায়াত মামুদ, খালেদ চৌধুরী, দ্বিজেন শর্মা প্রমুখ। বাংলার পাঠকদের কাছে পৌঁছে যেতে থাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ধ্রুপদি সাহিত্য, লোকগাথা, শিশুসাহিত্য। বাঙালি পাঠকের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল কয়েকটি পত্রপত্রিকাও— ‘সোভিয়েত দেশ’, ‘সোভিয়েত নারী’, ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে প্রবন্ধ, রাশিয়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান-বিষয়ক রচনা, কারিগরি শিল্প আর হাতের কাজের বিভাগ থাকত এগুলিতে।
তবে বাঙালির কাছে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে আদরের ছিল ছোটদের বই। ১৯৮২ সালে প্রগতি প্রকাশনার একটি শিশু বিভাগ গড়ে ওঠে, নাম ‘রাদুগা’। রুশ ভাষায় যার অর্থ রামধনু। ‘দাদুর দস্তানা’, ‘নাম ছিল তার ইভান’, ‘রুপোলী খুর’, ‘পীত দানবের পুরী’, ‘মোরগছানা’, ‘বাহাদুর পিঁপড়ে’, ‘আলতাজবা’— নামে আর বিষয়বস্তুতে বাঙালিয়ানা মাখা রঙিন বইগুলো ঘুরত বাচ্চাদের হাতে হাতে। অবন ঠাকুর-লীলা মজুমদার-সুকুমার রায় গুলে-খাওয়া প্রজন্মের বড় কাছের মনে হত সোভিয়েট সাহিত্যের এই চরিত্রদের। কেউ দুষ্টু, কেউ ভালমানুষ গোছের, কেউ ঝগড়ুটে, হিংসুটে, কেউ বা ভিতু। চুক আর গেকের মতো রেলগাড়ি চড়ে বরফের দেশে বাবাকে খুঁজতে যাওয়া, ছোট্ট মেয়ে দারিয়াঙ্কার মতো পোষা বেড়াল লাভালাইকাকে আদর দিয়ে ‘মানুষ’ করা, গরিব চাষির ছেলের হাতে খারাপ জমিদারের শাস্তি, এই সবের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠত কৈশোরের ভালমন্দের বোধ। ‘সাগরতীরে’ বইয়ের আলসে ছেলেটা দায়িত্ব নিতে শেখায় আর এফিমকাকার বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় স্বস্তির শ্বাস ফেলত সবাই।স্কো বা তাসখন্দে নিযুক্ত বাংলা অনুবাদকেরা নিয়মিত কাজ তো করতেনই, পাশাপাশি বাইরের অনুবাদকদের করা বেশ কিছু বই বার করত রাদুগা ও মির প্রকাশনী। পুষ্পময়ী বসুর ‘মা’ (গোর্কির ‘মাদার’ এর অনুবাদ), ইলা মিত্রের ‘চাপায়েভ’, শঙ্কর রায়ের ‘গমের শিষ’, ‘চুক আর গেক’, অনিমেষকান্তি পালের ‘কাশতানকা’র মতো বইয়ের স্মৃতি আজও অমলিন। কিন্তু সেই অনুবাদকদের কথা ক’জন মনে রেখেছি? সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর সরকারি অনুদানে নির্ভরশীল প্রকাশনাগুলো এক সময় বন্ধ হয়ে গেল। কাজ না থাকায় দেশে ফিরে এলেন অরুণ সোমের মতো অনুবাদকেরা। নতুন বই আর নেই, পুরনো বইগুলোও কদর হারিয়ে বিক্রি হয়ে গেল অনেকের বাড়ি থেকে, বা জায়গা পেল ধুলো-ভরা গুদামঘরে।পুরনো বইপ্রেমী দম্পতি সোমনাথ ও শুচিস্মিতা দাশগুপ্ত নিজেদের সংগ্রহে থাকা সোভিয়েট বইগুলো স্ক্যান করে ইন্টারনেটে দিচ্ছেন। সঙ্গে পেয়েছেন প্রসেনজিৎ, নির্জন, পরাগের মতো বহু বন্ধুকে। সবাই মিলে গড়ে তুলেছেন ব্লগ ‘সোভিয়েট বুকস ট্রান্সলেটেড ইন বেঙ্গলি’। তাঁরা যোগাযোগ করেেছেন অরুণ সোম, পূর্ণিমা মিত্রের মতো অনুবাদকদের সঙ্গে, পেয়েছেন তাঁদের শুভেচ্ছা। অরুণবাবু এখনও সক্রিয়, নতুন করে অনুবাদ করছেন ‘যুদ্ধ ও শান্তি’, ‘কারামাজ়ভ ভাইয়েরা’, ‘ইডিয়ট’। এক সময় প্রবাসে থেকে বাংলার শিশুদের হাতে যাঁরা তুলে দিয়েছেন বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ, তাঁদের কথা নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার কাজ করে চলেছেন এই কারিগরেরা। হারিয়ে যাওয়া শৈশব, ভালবাসার বইয়ের জগৎকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রয়াসে অতন্দ্র তাঁরা।
সবশেষে একটা কথা মনে করে অবাক লাগে। বই তো মানুষের মন তৈরি করে। সঠিক পথ বেছে নেওয়ার মন। রাশিয়া বিশ্বজুড়ে ভাল ভাল বই ছড়াল। সস্তায়, দামি কাগজে। সবাই পড়ে মন ভরাল, শিখল কত কিছু! কিন্তু নিজের দেশে কী হল ? সে দেশের মানুষ কেন অন্য পথ বেছে নিল? ঐতিহাসিকরা এর কারণ খুঁজবেন । রাজনীতিকরা খুঁজবেন। আমরা কিন্তু দুঃখ পাব।



































































No comments